পাভেল চৌধুরী: পটোম্যাক থেকে পদ্মা, হাডসন থেকে সুরমা কত বিখ্যাত নদীই’ত জীবনে দেখার সুযোগ হয়েছে।কিন্তু তার মত এমন করে কেউ আমাকে ধারন করেনি। আর আমিও শীতলক্ষার মত এত সুন্দর নদী কোথাও দেখিনি।হাজারো স্মৃতি বিজড়িত এই নদীকে ঘিরে আমার জীবনের বড় অংশ লিখে রাখার সময় অনেক কাল পেরিয়েছে, কিন্তু দেরী হয়ে যায়নি।
খুব ছোট থাকতে একবার নাকি আমরা নৌকা দিয়ে আসার সময় আমার হাতের ক্ষুদ্র আংগুল গলিয়ে শকুন্তলার মত একটি আংটি নদীতে পরে গিয়েছিল।এই একটি মাত্র বিসর্জনই আমি এই নদীকে দিতে পেরেছি। অথচ কত দশক ধরে সেতার বিপুল সৌন্দর্য্য সম্ভার আমাদের বিলিয়েদিচ্ছে তার হিসাব কে রাখছে? ক্লাস সিক্সে থেকে টেন পর্যন্ত্য আমাদের এমন একদিন যায়নি যে ক্লাস রুমের পুর্বপাশের খোলা জায়গায় আমরা গিয়ে না দাড়িয়েছি। সেখানে দাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত্য দেখা যেত। উত্তরে তাকালে ঐ দূরে যেখানে নদী বাক নিয়েছে সেখানেই চিনাডুলি। “চিনাডুলি”, নামটি চমৎকার না? আর পুবে তাকালে উপজেলা ঘাট, মাঝে কাপাসিয়া বাজার। খেয়াঘাটে নৌকা নিয়ে যাত্রির অপেক্ষায় মঝি।কেউ কেউ আবার এপার ওপারও করছে, কি সুন্দর দৃশ্য।
টিফিন পিরিয়ডে আমরা স্কুলের হোষ্টেল পেরিয়ে দেবদারু গাছের নীচ দিয়ে ঘাটে চলে যেতাম। মনে মনে আমি এর নাম দিয়েছিলাম দেবদারু ঘাট এখান দিয়ে শর্টকাটে বাজারে যাওয়া যেত, এই ঘাটে বাধা নৌকাচুরি করে নিয়ে আমরা বিচ্ছুরা মাঝে নদীতে চলে যেতাম গোসল করতে। হাটু পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকা চরে নৌকা ভিরিয়ে সাতার কাটতাম।কি অদ্ভুত সাহসী ছিল আমাদের শিশুকাল। এখন মনে হলে আঁতকে উঠি। এই নদীতেই প্রথম শিখেছি শীতের সকালে নদীর পানি গরম থাকে। কেন থাকে তার উত্তরের ধার ধারি নাই। পানি থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে দেখে অবাক বিষ্মিত হতাম। হয়ত মনে মনে তার সাথে চলত আমাদের কথোপকথন-
“নদী, তুমি কোন কথা কও? অশথের ডালাপালা তোমার বুকের ‘পরে পড়েছে যে, জামের ছায়ায় তুমি নীল হ’লে.আরো দুরে চলে যাইসেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে; নদী না কি?” – জীবনানন্দ দাশ, নদী
এমনই অনেক অবুঝ, অবোধ কাহীনি নিয়ে এগিয়ে যা যাবে – আহা শীতলক্ষ্যা। ভাল থাকনিরন্তর, কারন জীবন একটাই এবং তা অনেক সুন্দর।

আহা শীতলক্ষ্যা – প্রথম পর্ব
বলদা ঘাট এখান থেকেই শুরু হয় শীতলক্ষা দেখা। বাসা থেকে হেটে কলেজের গেইট পর্যন্ত্য এসেছি। ইচ্ছা ছিল ভিতরে ঢুকে কয়েকটি ছবি নিব। কিন্তু গেইটে তাকিয়ে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কোন এই সময় এই গেইটে লেখা ছিল – “দেশ সেবায় ছড়িয়ে পড়”। আজ সেখানে কিছুই লেখা নাই। নানা রঙেরপোষ্টার দেখে মনে হয় যেন বিয়ে বাড়ীতে এসেছি।গেইট থেকে যে রিকশায় উঠেছি তাতে আবার বাইকের মত মটর লাগানো। কত রকমের বাহন যে কাপাসিয়া সয়ল্যাব করেছে তার নমুনা কোন একদিন পোষ্ট আকারে দিব। রিকশাওয়ালাকে যত বলি আস্তে যাও ততই তার কাছে বিস্বাদ লাগে। হরিমঞ্জুর স্কুলের গেইট পাড় হতেই ভাগ্যদুতের নাগাল পেলাম। একটি প্যাডেল চালিত খালি রিকশা বাজারের দিকে যাচ্ছে। হাই স্পীড ছেড়ে লো স্পীডের রিকশা নিতেই হাইস্পীড ওয়ালা হতবাক। ভাবটা এমন যে এই পাগল আবার কোত্থেকে উদয় হল? নতুন রিকশাওয়ালা খুশী। তবে সে ঠিক বুঝতে পারছে না কেন আমি স্পীড লো করলাম। আমি ছুটিতে এসেছি। আমার কোন তাড়া নাই। তাই ধীরে চলছি। তাকে বুঝাবার প্রয়োজন বোধ করি নাই। আমার নির্দেশমত সেও নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ইচ্ছা ছিল মুল গন্তব্য বলদা যাবার আগে রাঙাদের বাড়ীর গেইট পেরিয়ে ভিতরে গিয়ে কিছু ছবি তুলে তাকে তাক লাগিয়ে দিব। গেইটে মস্ত তালা। রিকশা ভিতরে যাবে না।তাই ইচ্ছা পাল্টাতে হল। সোজা চলে এলাম বলদা ঘাট – আমার জিরো পয়েন্ট।

ছবি তুলতে চাইতেই হাসি মুখে বলল – ‘তুলেন অসুবিদা নাই’
এখানে প্রথমেই নজরে পরবে একটা কামারের দোকান। সেখানে কাজ চলছে। এদিকের লোকজন আমাকে বেশি একটা চিনে না। গলায় ডিএসএল ক্যামেরা দেখে মনে করেছে কোন ফ্রী-লেন্স সাংবাদিক। ছবি তুলতে চাইতেই হাসি মুখে বলল – ‘তুলেন অসুবিদা নাই’। ওরা যাতে আমাকে ভুল করে সাংবাদিক না ভাবে তাই জিজ্ঞাসা করলাম – ‘আমারে চিনছেন’। উত্তরে বললেন – ‘হ চিনতাম না কেরে’? উত্তর শুনে বুঝাই যাচ্ছে তিনি আমাকে চিনেন না। অথচ ডানপিঠের ছেলে পাভেল চৌধুরী এককালে এই এলাকার সব চালতা গাছের চালতা সাফাই করত। হিহিহিহি। মুল কথায় আসি। কামারের দোকান হল আমার বিষ্ময়ের ফোয়াড়া। লোহাকে পুড়িয়ে, পিটিয়ে, ভিজিয়ে কত কষ্ট করে একটি যন্ত্র বানানো হয় এখানে। আমাদের জীবনের সাথে এর অনেক মিল।স্কুল কলেজের ছাত্রজীবন হেলায়-ধুলায় কাটলেও আমেরিকার ছাত্রজীবন কামারের দোকানের এক টুকরা জ্বলন্ত লোহার মতই ছিল। আর আমরা নিজেরাই ছিলাম তার কামার।
কামারের দোকান পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম বটগাছের নীচে। গাছটিআসলে অশথ।বটের পাতা হয় কাঁঠালের পাতার মত। অশথের পাতা হয় পান পাতার মত। তবে বটের মত অশথ গাছ থেকে শিকড় ঝুলে পরে বলে আমার মত বৃক্ষমুর্খরা গুলিয়ে ফেলে। গাছের নিচে বাঁশের সারিসারি আটি সাজানো। ঘাটে অপেক্ষা করছে নৌকা। হাতের বামে ঝোপ পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ঝোপের ভিতর কয়েকটি বিড়ালছানা রোদ পোহাবে বলে খেলার ছলে হাতাহাতি করছে। ঘাটে বাঁধা আছে মালবাহী নৌকা। নৌকার গা ঘেসে কিছু কচুরীপানা আটকে আছে। না ঠিক নৌকায় আটকে নেই। খেয়াল করলে দেখা যায় কে যেন ছাটা দিয়ে মাছের আবাস বানিয়েছে। ঐ আবাসই হবে মাছের শেষ ঠিকানা। সেখান থেকে চলে আসবে আমাদের পাতে। ব্যাপারটা বেশি মনোযোগ দিলে হয়ত আমাদের মাছ খাওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে। ছাটাগুলি আটকে রাখার জন্য কিছু মলিবাশ খুটির মত করে পানির নীচে পুতে রাখা হয়েছে। তারই মাথায় বসে অপেক্ষা করছে একটি মাছরাঙা। এইত আমার শীতলক্ষা্র রুপ।

কুয়াশা তখনো কাটেনি। কিছু হাসের দল একসাথে ভেসে বেড়াচ্ছে। নদীর পাড়ে মানুষেরা ছিপ ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। আমি আমার মত করে ছবি তুলছি। আর মনের মাঝে ছায়ছবির মত ঘুরছে কত কথা – কোথায় ইতালীর কোমো লেইক, কোথায় সুইজারল্যান্ডের লোগানো লেইক? আমার এই শীতলক্ষা প্রকৃতির যে আদিম রুপ নিয়ে সেজে বসে আছে তার কি তুলনা হয়? কালো-কালো পাখিরা বাঁকা ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলে যায় দূরে, উঁচু থেকে ওরা আমাদের দেখতে কি পায়?
আমি দেখতে পাই এই বাংলার রুপ, আমি দেখে অবাক হই এই শীতলক্ষার রুপ।জীবনানান্দ ধারন করে মনে মনে বলে উঠি – একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে\ বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে রবো-পশমের মতো লাল ফুল\ ঝরিবে বিজন ঘাসে, বাঁকা চাঁদ জেগে রবে,- নদীটির জল।