ঢাকা বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬

পাল্টে যাবে শাহজালাল বিমানবন্দরের চেহারা

এ পাশে ফাইভ স্টার ও পাশে থ্রি স্টার হোটেল। মাঝে নয় লাখ স্কয়ার ফুটের বিশ্বমানের শপিংমল। তিনটেই কেন্দ্রীয় সংযোগে বাধা। এর সামনে দিয়ে সোজা চলেছে অনন্য কারুকার্যের একটা টাইলস লেন। আভিজাত্যের শেষ নয় এখানেই। ফাইভ স্টার হোটেলে থাকছে এমন এক ফুড কোর্ট, যেখানে মিলবে-ওয়েস্টার্ন, এরাবিয়ান, প্রাচ্য-দূরপ্রাচ্যের সব দেশের কুইজিন। আরও আছে বিজনেস সেন্টার, অফিস স্পেশ, হ্যারিটেজ মিউজিয়াম, চাইল্ড এমিউজমেন্ট, গ্রিনারি সাইট, ডিজিটালাইজড কার পার্কিং, একাধিক বার রেস্টুরেন্ট, সুইমিংপুুল, রকব্লাস্টার ৪টি সিনেপ্লেক্সÑযেখানে প্রদর্শিত হবে হলিউড কাঁপানো সব মুভি।

টপ ফ্লোরে নয় হাজার স্কয়ার ফুটের একটা প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। তাতে মার্বেল টাইলসের চোখ ধাঁধানো কারুকাজ, বিশাল লাউঞ্জ, দুটো বেড রুম, নিজস্ব সুইমিংপুল, নিজস্ব কিচেন, গেস্ট কর্নার, বার রেস্টুরেন্ট। থাকছে ছাদে বসে সেন্ট্রাল মনিটরের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার নৈসর্গিক দৃশ্য দেখার বিরল সুযোগ।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে দেশী-বিদেশী যাত্রীরা হোটেলে বসেই পাবেন চেকইন করার সুবিধা। এখানে চেকইন করার পর তাদের লাগেজ সরাসরি চলে যাবে, টিউব ট্যানেলে বিমানবন্দরে। যাত্রীরা হোটেল থেকে সরাসরি চলে যাবেন বিমানবন্দরের লাউঞ্জে।
এভাবেই সাজানো হচ্ছে। বহুল আলোচিত ইপকো প্রকল্প। সিভিল এ্যাভিয়েশন বলছে-এটা হবে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম হোটেল কাম শপিংমল। ইপকোর উদ্বোধনের পর পাল্টে যাবে শাহজালাল বিমানবন্দরের চেহারা। দু’হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ দেখে এখন অভিভূত পথচারীরা। সিভিল এ্যাভিয়েশন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে।

হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে যে কারোর চোখে পড়ে-বিশালাকার সুরম্য অট্টালিকার মতো এ স্থাপনা। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা জটিলতা আর প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্বপ্নের ইপকো আজ সত্যি হতে চলছে। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা। এ প্রকল্প সিভিল এ্যাভিয়েশনের এ যাবতকালের সবচেয়ে বিশাল অর্জন হিসেবে বিবেচিত। দিন-রাত অবিরাম এগিয়ে যাচ্ছে নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে প্রায় ষাট ভাগেরও বেশি কাজ সম্পন্ন। আগামী বছরের মাঝামাঝি থ্রি স্টার হোটেল ও শপিংমল উদ্বোধন করার মতো প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে ফাইভ স্টার হোটেলের কাজ সম্পন্ন করতে লাগবে আরও দেড় বছর।

নীরবে নিভৃতে এত দ্রুত ইপকোর কাজ সম্পন্ন হওয়াটাও যেন অনেকটা অবিশ্বাস্য। কারণ স্বপ্নের ইপকোর পেছনে রয়েছে অনেক ঘটনাপ্রবাহ। আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশাল সম্ভাবনাময় প্রকল্প কিভাবে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার নানামুখী ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল-এটা তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। বলা চলে-ইপকোর চলার পথ ছিল ভীষণ বন্ধুর।
সেটা ছিল ২০০০ সাল। শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম আমল শেষ হওয়ার আগেই নেয়া হয় এ পরিকল্পনা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক শীর্ষ কোম্পানি ইপকো প্রস্তাব দেয়-তারা ঢাকায় সিভিল এ্যাভিয়েশনের নিজস্ব ভূমিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল কাম শপিংমল, লং টেনিস কোর্ট ও গলফ কোর্ট নির্মাণের। বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তৎকালীন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে ইপকোকে ১৪৩ একর জমি ষাট বছরের জন্য ভাড়া প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় সিভিল এ্যাভিয়েশন। যথারীতি সিভিল এ্যাভিয়েশন ও ইপকোর মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিও সম্পন্ন হয়। তখন ইপকোর ১৫ শতাংশ মালিকানা নিয়ে লোকাল পার্টনার ছিল কাজী শহীদ কোম্পানি। এ অবস্থায় দ্রুত ইপকোর ডিজাইন, নক্সা ও মূল স্থাপনার অনুমোদনও দেয় রাজউক। দ্রুত সময়ে ইপকোর ভিত্তি প্রস্তরও স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তার পরই ঘটে যায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর তাদের শ্যেন দৃষ্টি পড়ে ইপকোর ওপর। জোট সরকার এ প্রকল্পে বড় ধরনের কোন অনিয়ম বা অযৌক্তিক কিছু না পেলেও এটাকে বিলাসী স্বপ্ন বলে অভিহিত করে। মূলত তখন আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া এত বড় প্রকল্প ভেস্তে দেয়ার মানসিকতায় নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়। প্রকল্পের কাজে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করে সরকার। এক পর্যায়ে হঠাৎ ডিজাইনে ভুল থাকার মতো তুচ্ছ অজুহাতে গোটা প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল করে দেয় তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী। এতে নির্মাণকাজ থেমে যায়। বাধ্য হয়ে সিভিল এ্যাভিয়েশনের বিরুদ্ধে মামলা করে ইপকোর লোকাল পার্টনার কাজী শহীদ গং। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ২০০৯ সালে ইপকোর লোকাল পার্টনারের কাছ থেকে মোট ১৫ শতাংশের সবটুকুই কিনে নেয় দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ও সামিট গ্রুপ। দেশের এ্যাভিয়েশন খাতের ক্রমবর্ধমান অবস্থান বিবেচনায় রেখে ইপকোর নেয়া প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তৎপর হন তৎকালীন বিমানমন্ত্রী ফারুক খান ও সিভিল এ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসাইন। এতে সিভিল এ্যাভিয়েশন ইপকোর লোকাল পার্টনারের সঙ্গে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী সিভিল এ্যাভিয়েশন ইপকোকে মাত্র ১৪ একর জমি দিয়ে বাকি জমি ফেরত নেয়। আর ইপকোও সিভিল এ্যাভিয়েশনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। তারপর থেকেই থমকে যাওয়া কাজ দ্রুত শুরু করে ইপকো। প্রকল্পের সময়সীমা ৩ বছর নির্ধারণ করে ফের কাজ শুরু হয় গত বছরের এপ্রিলে। এতে বিগত দেড় বছরেই কাজের প্রায় বেশিরভাগ শেষ হওয়ার পথে। থ্রি স্টার হোটেল ও শপিংমল আগামী বছরের মার্চে শুভ উদ্বোধন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ইপকো ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ রাজা। তিনি বলেন, বিগত এক যুগ ধরে ইপকো সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক প্রচারই করা হয়েছে। এ প্রকল্পের বিপুল সম্ভাবনার প্রমাণ পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আর কিছুদিন। এটাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় একটি হোটেল কাম শপিংমল হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
কি থাকছে স্বপ্নের ইপকোতে?
জবাবে বিমোহিত হওয়ার মতো কথা শুনিয়েছেন ইপকো প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক সচিব সাইফুল ইসলাম খান। কি নাই তাতে পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন তিনি-শপিংমল, এমিউজমেন্ট পার্ক, চাইল্ড কর্নার, বিশালাকারের সিনেপ্লেক্স, সুইমিং পুল, পৃথিবীর প্রায় উল্লেখযোগ্য দেশের কুইজিন, যাত্রীদের চেকইন কাউন্টার, বিমানবন্দরে সঙ্গে কানেকটিং টিউব, টপ ফ্লোরে প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট, দেড় হাজার গাড়ির ধারণক্ষমতার পার্কিং জোন, চার হাজার অতিথির বনকোয়েট হলসহ আরও অনেক চমকপ্রদ সুবিধাদি।
তিনি জানান, মোট পনেরো একর জমির ওপর এই তিনটি প্রকল্প। বাণিজিক পরিমাণে সেটা ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৭ বর্গফুট, যাতে থাকছে দুটি হোটেল, একটি শপিংমল ছাড়াও অফিস স্পেশ। মোট জমির ৪০ শতাংশ রাখা হচ্ছে ফাঁকা-সবুজ বনানীর ছায়াঘেরা সুশীতল এলাকা হিসেবে। হোটেল ও শপিংমলের সব জরুরী সার্ভিস হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে। দর্শকরা প্রবেশ করবেন, এক পথে বের হবেন অন্যপথে। এ তিনটে প্রতিষ্ঠানেরই আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ একটি কোম্পানি।
ইপকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ রাজা জানান-এ হোটেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে থাকবে বিশ্বমানের সেবাও সুযোগ-সুবিধা। ফুড কোর্টে গিয়ে যে কোন দেশের নাগরিক তার ইচ্ছেমতো ম্যানু চয়েস করতে পারবে। এরাবিয়ান, পশ্চিমা রীতি ছাড়াও দূরপ্রাচ্যের কুইজিন থাকবে। শপিংমলে থাকবে বিশ্বের সব ব্র্যান্ডের আউটলেট। হোটেলে বসেই যাতে যাত্রীর তাদের চেকইন সারতে পারে সে জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। হিথরো বিমানবন্দরে যেভাবে হোটেল হিলটনের যাত্রীরা চেকইন করে, একইভাবে ইপকো থেকে যাত্রীরা তাদের লাগেজ দিয়ে, টিকেট ওকে করে, টিউব ট্যানেল দিয়ে সরাসরি চলে যাবে বিমানবন্দরে।
তিনি বলেন-ফাইভ স্টার ও থ্রি স্টার দুটো হোটেলই হবে বারো তলার। ফাইভ স্টারের টপ ফ্লোরের নয় হাজার স্কয়ার ফুটের সবটুকুতেই নির্মাণ করা হবে একটি এক্সক্লুসিভ প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। দেশে তো বটেই, এই উপমহাদেশের কোন হোটেলেও এত বড় প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট নেই। এমনকি সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ডের হোটেলের চেয়ে-এর বৈশিষ্ট্য হবে আকর্ষণীয়। এখানে সাধারণত রাষ্ট্রীয় অতিথি বা শীর্ষ কর্পোরেট ব্যক্তিত্বরা প্রাধিকার পাবেন।
দেশীয় অর্থনীতিতে এ প্রকল্প কি ধরনের ভূমিকা রাখবে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম খান বলেন-ফাইভ স্টার হোটেলটি চালান হবে বিশ্বের শীর্ষ কোন চেন ম্যানেজমেন্ট দ্বারা। এতে দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এর সবটিই নেয়া হবে দেশীয় মেধা থেকে। বিদেশী চেনে হয়ত টপ লেভেলে হাতেগোনা ক’জন থাকবেন। কারণ চেনের মাধ্যমে বিদেশে দেশের টাকা চলে যাক-এটা আমরা চাই না। যে বিনিয়োগ এতে হচ্ছে সেটার ফিডব্যাক যদি সেভাবে আসে তা হলে জাতীয় মোট প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) কমপক্ষে শূন্য দশমিক ২৫ ভাগ অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে আরও অনেক বিজনেস কর্নার। এয়ারলাইন্সের পাইলট, কেবিন ক্রু, ট্রানজিট যাত্রীসহ দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী ও সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তারা এখানকার আতিথেয়তার সুযোগ পাবেন। এখন বিমানবন্দর থেকে যানজট পেরিয়ে ভাল হোটেলের জন্য গাড়িতে কাটাতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চালু হলে তাদের কাছেই ইপকো হবে এক নম্বর চয়েস।
সাইফুল ইসলাম আরও জানান, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীর নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট সংলগ্ন এ ধরনের নামী-দামী হোটেল থাকে। অথচ এখানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বার বার হোঁচট খেয়েছে। এখনও হোটেলের সামনে অনেক দৃষ্টিকটু স্থাপনা রয়েছে। এগুলোর অপসারণ না করা হলে প্রকল্পের প্রকৃত সৌন্দর্য আড়ালে থেকে যাবে।
তিনি বলেন-এ প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে আবহমান বাংলার শাশ্বত রূপ ফুটিয়ে তোলা, যেমন হোটেলের সামনের দিকে থাকছে পানির ফোয়ারায় বিশালাকারের শাপলা ও দেশীয় সংস্কৃতির নানা আবহ। বিভিন্ন দেয়ালের কারুকার্যে থাকছে বাংলার কিষান-কিষানী, দুর্বার দুরন্ত বাংলার দামাল ছেলেমেয়েদের নানা ধরনের পেশার ছাপ। থাকবে বাংলার দুই হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সমাহার। ইপকোর নির্মাণশৈলীতে যে কোন মানুষ পুলকিত হবে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই চোখের সামনে এমন একটি প্রতিষ্ঠান দেশের ভাবমূর্তি সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ধারণা দেবে। মূলত এটা হবে মিরর অব দ্য কান্ট্রি। এখানে কি ধরনের আভিজাত্যের ছোঁয়া রয়েছে, সেটা কেবল উদ্বোধনের পরই উপলব্ধি করা যাবে।