ঢাকা রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬

বাংলাদেশের পাপেট শিল্প বিকাশের পুরোধা চিত্রশিল্পী মুস্তফা মনোয়ার আর নেই

বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের এক বিশাল নক্ষত্র মুস্তফা মনোয়ার ইন্তেকাল করেছেন।
ইন্না লিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহী রাজিউন।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণা, পাপেটের বিকাশ, টেলিভিশন নাটকে অবদানের জন্য চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন মুস্তফা মনোয়ার।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক শিল্পী পরিবারে মুস্তফা মনোয়ারের জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে।
বাবা গোলাম মোস্তফার ফটোগ্রাফি চর্চা আর বইয়ের ইলাস্ট্রেশন দেখে এবং মেজ ভাই মুস্তফা আজিজের ছবি আঁকা দেখে তিনি শিল্পকলার বহু দিকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। কলকাতার বালিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে কবি গোলাম মোস্তফা যখন হুগলি কলেজিয়েট স্কুলে গেলেন তখন মুস্তফা মনোয়ার এখানকার গঙ্গার বিস্তৃতি দেখে খুশি হয়ে ওঠেন। আর এখানে এসেই তাঁর শিল্পী জীবনের সচেতন যাত্রা শুরু হয়।

মুস্তফা মনোয়ারের মা মারা যাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল পাঁচ বছর।মা না থাকায় গ্রামের সবাই তাঁকে খুব স্নেহ করত। ছোটাবলায় প্রথম একবার তিনি পানিতে ডুবে যান, সে যাত্রায় পানিতে ঝাঁপ দিয়ে তাঁকে তাঁর মেজ বোন তাড়াতাড়ি উদ্ধার করেন। এরপর থেকে তাঁকে সবাই খুব চোখে চোখে রাখতেন। কিন্তু শিশু মনোয়ার সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে গামছা দিয়ে ডোবায়, পুকুরে, বিলে এবং নদীতে মাছ ধরতে যেতেন।

তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফা কর্মসূত্রে থাকতেন কলকাতায়।বাবার সঙ্গে তাই তাঁকেও অধিকাংশ সময় কলকাতায় থাকতে হয়েছে।তবে মাঝেমধ্যেই তাঁর বাবা বেশ ঘটা করে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে মনোহরপুর চলে আসতেন। আসার সময় কলকাতা থেকে অনেক গুণীজনকেও তিনি গ্রামে নিয়ে আসতেন এবং গ্রামময় গানবাজনা আর লাঠিখেলার উৎসব আয়োজন করতেন। এসব আয়োজন হতো তাঁদের বাড়ির সামনের উন্মুক্ত কাচারি ঘরকে ঘিরে। এখানে নিয়মিত অতিথি হতেন কন্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দিন। আর তিনি এলে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দরাজ গলার গান ছিল ধরাবাঁধা।

কলকাতায় থাকতে অনেক ছোট বয়স থেকেই মুস্তফা মনোয়ার গ্রামোফোন বাজাতেন।রেকর্ড বাজালেই মনোয়ার রেকর্ডের সামনে গিয়ে বসে থাকতেন এবং তাঁর পছন্দের গানগুলো যেকোনো রেকর্ড থেকে বের করে দিতে পারতেন। তখন তাঁর অক্ষর পরিচয় হয়নি এবং রেকর্ডের সবগুলোর চেহারা ছিল একই রকমের। রেকর্ড থেকে পছন্দের গান বের করার এই প্রতিভা দেখে তাঁর বাবা বেশ অবাক হয়েছিলেন এবং বন্ধুবান্ধবকে ডেকে দেখাতেন।জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকেও মুস্তফা মনোয়ারের এই প্রতিভা দেখিয়েছিলেন তাঁর বাবা।
ভাষা আন্দোলনের সময় মুস্তফা মনোয়ার ছিলেন নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্র।থাকতেন নারায়ণগঞ্জে মেজ বোনের বাড়িতে। নারায়ণগঞ্জ থেকেই তিনি শুনতে পেলেন ঢাকায় গুলি হয়েছে, কয়েকজন ছাত্র শহীদ হয়েছে। পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষা বন্ধ করে দিতে চায়।সেই প্রেক্ষাপটে মুস্তফা মনোয়ার ছবি আঁকতে শুরু করলেন এবং সেই ছবি বন্ধুদের সঙ্গে সারা নারায়ণগঞ্জ শহরের দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দিতে লাগলেন। ফলশ্রুতিতে পুলিশ এসে তাঁকে এবং তাঁর দুলাভাই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লুৎফর রহমানকে বন্দি করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দিলেন।দীর্ঘ একমাস কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পেলেন।
ছবি আঁকার কারণে কিশোর বয়সে কারাবরণ করা এই শিল্পী কারাগার থেকে মুক্তির পর ছবি আঁকা থেকে কিন্তু পিছপা হননি। বরং তিনি ছবি আঁকায় আরও বেশি মনযোগী হয়েছিলেন। আর তাইতো পরবর্তীতে চিত্রশিল্পে তাঁর স্বতঃস্ফুর্ত পদচারণা, বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক পাপেটের বিকাশ, টেলিভিশন নাটকে তাঁর অতুলনীয় কৃতিত্ব আমরা দেখতে পাই। তিনি শিল্পকলার উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’ নির্মাণ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ শিল্পের নানা পরিকল্পনায় তিনি বরাবর তাঁর সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে মুস্তফা মনোয়ার কলকাতায় গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন সায়েন্সে। পড়ালেখায় মনোযোগ তাঁর কোনোদিনই ছিল না, তার উপর আবার কলেজে ভর্তি হয়েছেন সায়েন্সে, অথচ অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। তখন তাঁদের কলেজে দু মাস পরপর ক্লাস পরীক্ষা হতো। ভালো নম্বর যাঁরা পেতেন ক্লাসে সবার সামনে তাঁদের ডেকে সবাইকে দেখানো হতো। একদিন স্যার অঙ্কের খাতা দিতে এসে কয়েকজন ভালো নম্বরধারী ছাত্রের নাম ধরে ডাকলেন এবং খাতা দেওয়ার পর হঠাত্‍ বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলেন ‘মুস্তফা মনোয়ার।বেশ হাসি হাসি মুখ নিয়ে মুস্তফা মনোয়ার উঠে দাঁড়ালেন। শিক্ষক তো তাঁর মুখে হাসি দেখে অবাক, ‘এই ছেলে, তুমি কত পেয়েছ জানো? হাসছো! তুমি চার পেয়েছ।’ ছেলেটা আরো হাসছে।এখনো হাসছ! লজ্জা করছে না! অঙ্কে কেউ কোনোদিন চার পায়?’ ছেলেটা বলল, ‘স্যার কোন অঙ্কটা ঠিক হয়ে গেল, তাই ভেবে হাসছি।’ অঙ্কে এত খারাপ করে সায়েন্সে পড়া মুশকিল।এসময় বিপদ থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। মুস্তফা মনোয়ারদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন এই গুণী লেখক। খুব রসিক মানুষ, অনেক নামডাক, দেশ-বিদেশ বেড়িয়েছেন।তিনি মাঝে মাঝে তাঁর ছবি দেখতেন এবং খুব প্রশংসা করতেন।

মুজতবা আলী একদিন বললেন, ছেলেটার এত ভালো গুণ সায়েন্স পড়ে নষ্ট হবে! তিনি মুস্তফা মনোয়ারের বড় ভাবির সঙ্গে তাঁকে কলকাতা আর্ট কলেজে নিয়ে গেলেন। শিল্পী রমেন চক্রবর্তী তাঁর আঁকাআঁকি দেখে খুশি হয়ে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি।মুস্তফা মনোয়ার প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। এই স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি গান হতো, ব্রতচারী হতো। স্কুলে পড়ার সময় তিনি বাবা ও বড়ভাইয়ের কাছ থেকে সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন। সঙ্গীতের শিক্ষায় তাঁর প্রথম শেখা রাগের নাম হচ্ছে জৈনপুরি।

১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন মুস্তফা মনোয়ার। তিনি যখন আর্ট কলেজে পড়তে শুরু করেন তখন নতুন করে আবার সঙ্গীত শিক্ষার সূচনা করেন ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে। আর্ট কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে তিনি ‘হিজ মাস্টার ভয়েস কম্পিটিশনে’ অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে একক সঙ্গীত পরিবেশনার জন্য বশীর আহমেদ এবং সুবীর সেনের সঙ্গে যুগ্মভাবে সেরা গায়ক নির্বাচিত হন। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থেকে গান করেছিলেন। পরে ছবি আঁকার ব্যস্ততার কারণে মুস্তফা মনোয়ারের আর গান গাওয়া হয়নি। কিন্তু সুর থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন নন কোনোদিনই। তাঁর পাপেট শিল্প সুর, কথা, গান অভিনয়, চিত্রকলা, কবিতা সব শিল্পকেই ধরে রেখেছেন।
১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মুস্তফা মনোয়ার। পারিবারিক উদ্যোগে তাঁরা বিয়ে করেন । তাঁদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার এবং এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।
কর্মজীবন শুরু করেন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদ দিয়ে। এটাও জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে। তিনি ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এরপর দেশে নতুন এক গণমাধ্যমের সূচনা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৬৪ সালে যাত্রা করলে, সেখান থেকে অনুরোধ করা হয় তাঁকে যোগদানের। তিনি সানন্দে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা’র জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৭১ সালে ভারতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রথম বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দান করেন।

১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে জনপ্রিয় ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের রূপকার তিনি। এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নির্মাণের দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিত হয়েছেন।

১৯৭৬ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দান করেন। ১৯৮০ সালে হংকং-এ অনুষ্ঠিত এশিয়ান সাংস্কৃতিক উৎসবে অনুষ্ঠান পরিচালকরূপে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে সিউলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। তাসখন্দে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পাপেট সম্মেলনে বাংলাদেশ পাপেট প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দান ও শো উপস্থাপন করেন।ওয়ার্ল্ড ভিউ ফাউন্ডেশন আয়োজিত শ্রীলঙ্কা, কলম্বোতে এ্যানিমেশন এ্যান্ড পাপেট ফর টিভি শীর্ষক সম্মেলনে রিসোর্স পারসন হিসেবে, ১৯৯১ সালে সিঙ্গাপুরস্থ এশিয়ান ম্যাস কমিউনিকেশন রিসার্চ ইনফরমেশন সেন্টার আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে এবং ১৯৯২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ইউনিসেফ আঞ্চলিক দফতর নেপালে অনুষ্ঠিত মা ও শিশু উন্নয়ন বিষয়ক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন মুস্তফা মনোয়ার। এছাড়া তিনি আরও বহু দেশ সফর করেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে নতুন শৈলীর অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তফা মনোয়ার বরাবর অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন।তাঁর প্রযোজিত শেক্সপিয়রের ‘টেমিং অব দি শ্রু’র মুনীর চৌধুরী অনূদিত বাংলা টেলিভিশন নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ ইতিহাস সৃষ্টি করে আছে। এই নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়। সার্কভুক্ত দেশের টেলিভিশনের জন্য নির্মিত শিশুদের শিক্ষামূলক মীনা কার্টুন বা আনিমেশন ফিল্মের পরিকল্পকদের মধ্যেও তাঁর সক্রিয় অবস্থান ছিল। টেলিভিশনের ছোট স্টুডিওতে ত্রিমাত্রিকতা রচনা করে তিনি তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ করেন।
কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছোটবেলাতেই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। আর এখন তো বাংলাদেশের পাপেটচর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ তিনি। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের তিনিই মূল উদ্যোক্তা। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছিলেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। প্রথমবার তিনি তাঁর নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। মুস্তফা মনোয়ার তাঁর সফল শিল্পকর্মের স্পন্দনে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেঁথে দিতে সিদ্ধহস্ত। যে কারণে তাঁর পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয় পারুল। ‘পারুল’ নামটির সঙ্গে সঙ্গে সেই সাত ভাই জাগানো লোককথার কথা মনে হয়। পারুল বোন একটিই, সেই-ই তো একদিন সাত ভাইকে জাগিয়েছিল। এই মর্ত্যে আবার নবজাগরণের ঘটনাটা খুব সম্ভবত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার সেই ‘পারুল’ বোনটির মাধ্যমেই ঘটাতে চান। কেননা, তিনি তাঁর পাপেটকে এখন আনন্দময় শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রয়োগ করতেই অধিক ব্যস্ত। ১৯৬০-৬১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কলিম শরাফী তাঁর একটি ডকুমেন্টারিতে সর্বপ্রথম মুস্তফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছোটবেলাতেই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। আর এখন তো বাংলাদেশের পাপেটচর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ তিনি। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের তিনিই মূল উদ্যোক্তা। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছিলেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। প্রথমবার তিনি তাঁর নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। মুস্তফা মনোয়ার তাঁর সফল শিল্পকর্মের স্পন্দনে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেঁথে দিতে সিদ্ধহস্ত। যে কারণে তাঁর পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয় পারুল। ‘পারুল’ নামটির সঙ্গে সঙ্গে সেই সাত ভাই জাগানো লোককথার কথা মনে হয়। পারুল বোন একটিই, সেই-ই তো একদিন সাত ভাইকে জাগিয়েছিল। এই মর্ত্যে আবার নবজাগরণের ঘটনাটা খুব সম্ভবত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার সেই ‘পারুল’ বোনটির মাধ্যমেই ঘটাতে চান। কেননা, তিনি তাঁর পাপেটকে এখন আনন্দময় শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রয়োগ করতেই অধিক ব্যস্ত। ১৯৬০-৬১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কলিম শরাফী তাঁর একটি ডকুমেন্টারিতে সর্বপ্রথম মুস্তফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

এরশাদের শাসনামলে তাঁর নিজের লেখা দু’টি গান তার গোটা শাসনামল জুড়ে বোধহয় কয়েক হাজার বার বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ম্যুরাল বানানোর খবর শুনেই এরশাদ তার একটি গানের প্রথম দু’লাইন এতে যুক্ত করার নির্দেশ দেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ম্যুরালটি রাষ্ট্রপতির হাতে উন্মুক্ত করা হয়। তৎকালীন বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এরশাদ বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন যে তার গান এতে সংযুক্ত হয়নি। ক্ষুদ্ধ এরশাদ মুস্তফা মনোয়ারকে তীব্রভাষায় তিরষ্কার করেন। এর কিছু সময় পরেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ছাড়াও বিটিভির জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে মুস্তফা মনোয়ারের এখানে আলাদাভাবে লিখিত বানী পাঠ করার কথা ছিল। কিন্তু এরশাদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি মঞ্চে বক্তৃতা দিতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত ঘোষণা আসে; ‘অনিবার্য কারন বশত মুস্তফা মনোয়ার বক্তব্য রাখতে পারছেন না। আবদুল্লাহ আল মামুন তার ভাষণটি পাঠ করবেন।’ বিটিভি ভবনের পাশ দিয়ে গেলে সহজেই ম্যুরালটি চোখে পড়বে। আজও এটি মুস্তফা মনোয়ারের প্রতিকী কিন্তু দুঃসাহসী প্রতিবাদের সাক্ষ্য দেয় এবং ঘোষণা করে এরশাদের মত নির্লজ্জ স্বৈরাচার কিছুতেই বাংলার সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে জলরঙের চর্চায় তিনি অবদান রেখেছেন। জলরং ছাড়াও তেলরং ও গ্রাফিক্সে শিল্পী মুস্তফা মনোয়ারের দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। সেই ছাত্রজীবন থেকে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার পাওয়ার যে শুরু, তা জীবনভর চলে। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমী অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি।১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ শাখার শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য দুটি স্বর্ণপদক পান।

চারুকলার গৌরবময় অবদান ও কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক-এ ভূষিত হন তিনি। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে টিভি নাটকের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য টেনাশিনাস পদক লাভ করেন। চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশু কেন্দ্র থেকে ২০০২ সালে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯২ সালে চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালে শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কর্তৃক ‘কিডস সম্মাননা পদক-১৯৯৯’ এ ভূষিত হন। ২০০২ সালে চারুকলা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী কতৃর্ক ঋষিজ পদক-২০০২ ভূষিত হন।

এছাড়া তিনি আরও বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১১ সালে পাক্ষিক ম্যাগাজিন সিনে তারকা, ২০১৪ সালে আরটিভি স্টার পুরস্কার-২০১৩ এবং ২০১৬ সালে এসএ টিভি তাঁকে দেয় আজীবন সম্মাননা। ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ’ থেকে ‘সব্যসাচী শিল্পী’ উপাধি দেয়া হয়। ২০১৭ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০৩তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চারুকলা অনুষদ’ থেকে ‘জয়নুল সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশের এই প্রথিতযশা এই বরেণ্য শিল্পী বেঁচে থাকবেন তাঁর আজীবনের শৈল্পিক কাজের মধ্য দিয়ে।
পৃথিবী বরেণ্য এই মহান শিল্পী মুস্তফা মনোয়ারের মৃত্যুতে সমগ্র দেশ প্রেমিক শিল্পমনা মানুষের মাঝে তিব্র শোক নেমে এসেছে।

তথ্যসূত্র: বাঙালীয়ানা,সাইমন জাকারিয়া, গুণীজন ডট কম, দৈনিক ইত্তেফাক, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, একাত্তরের দিনগুলি (জাহানারা ইমাম)।

আমাদের সাথে থাকুন