ক্ষুদ্র পরিসরে বাড়ি ঘরে অল্প পরিমানে কোন পণ্য তৈরি করতে গিয়ে শিল্প সত্তাকে লালন করে যে কুটির শিল্পের বিকাশ হয়েছিল আবহমান বাংলায়। সেখানে ঐতিহ্য সংস্কৃতি এবং ইতিহাস ফুটে উঠতো গ্রামীন শিল্পের নিপুন ছোঁয়ায়। সেই ধারাবাহিকতা কে সদুর প্রসারী চিন্তায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে সরকারি আইনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা(ইপসিক)প্রতিষ্ঠিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে পুনর্গঠিত করে নতুন নামকরন করে,বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)।
বাংলাদেশে কুটির শিল্পের মধ্যে মৃৎশিল্প,বস্রশিল্প,পাটজাত শিল্প,নকশি কাঁথা, শীতলপাটি,বাঁশ বেত বা তালপাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা তেমনি উল্লেখযোগ্য একটি কুটির শিল্প। অঞ্চলভেদে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারিগররা এ শিল্পের জন্য বিখ্যাত।তেমনি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর গ্রামের মানুষের হাতে তৈরি তালপাতার হাত পাখার সুনাম দেশজুড়ে।কথা হয় এ গ্রামেরই মোমেনা বেগমের সাথে।জীবন যুদ্ধে হার না মানা সংগ্রামী একযুদ্ধা মোমেনা বেগম।স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে জামান উরফে জবানকে নিয়ে বহু ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে তালপাতা দিয়ে হাতপাখা তৈরি করে বহু দুঃখ কষ্ট করে সংসার পরিচালনা করছেন এবং সেই সাথে বাঁচিয়ে রেখেছেন প্রবাহমান বাংলার এ ঐতিহ্যকে।পাখা তৈরির জন্য অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ডাটা সহ কাঁচা তালপাতা কিনে বাড়ি নিয়ে আসে জবান।তারপর থেকেই পাখা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু।প্রথমে পাতা রোদে ভাল করে শুকিয়ে নিতে হয়,পরে তা পরিমান মতো পাখার সাইজ করে কেটে বাঁশের চিকন সলাকার ফ্রেমে বেঁধে পুনরায় রোদে শুকাতে হয়।ভাল করে শুকিয়ে গেলে পাখার চারদিকে বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে সেলাই করে মজবুদ করে বেঁধে দিলে পাখা দেখতে আরও বেশ লাগে।শীতের সময় পাখার চাহিদা কম থাকলেও জবানরা এসময় পাখা তৈরি করে মজুত করে এবং গরমের সময় তা একসঙ্গে বিক্রি করে ফেলে।এতে করে সংসারের উপার্জনটা তখন একটু বেড়ে যায়।তবে পুঁজির অভাবে অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব হয় না।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যুগে যুগে এই হাতপাখা নিয়ে অনেক লেখক,কবি, সাহিত্যকের রয়েছে সহস্র রঙবেরঙের রচনা সমগ্র।ইত্যাদি খ্যাত কণ্ঠশিল্পী আকবরের সেই বিখ্যাত গান কে না জানে,তোমার হাত পাখার বাতাসে প্রান জুড়িয়ে আসে। সত্যিই এক একটা হাতপাখা কেবলই পাখা নয়,এ যেন এক একজন শিল্পীর কারিগরি হাতের ছোঁয়া এবং তার হৃদয় গভীরের একরাশ ভালোবাসার শীতল পরশ।কুটির শিল্পের অন্যতম একটি অংশ এই হাতপাখার প্রতিটি বুনটে জড়িয়ে আছে তার নির্মাণ কুশলীর শত দুঃখ কষ্ট,পাওয়া না পাওয়ার লুকায়িত বেদনা।কেবল শিল্প কিংবা সংস্কৃতির জন্য নয়,নিতান্তই জীবন ও জীবিকার তাগিদে আজো কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মোমেনা বেগম এবং জবানের মত খেটে খাওয়া মানুষেরা।