ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬

কাপাসিয়ার মুগ্ধ পথে- সজল জাহিদ

এই পথ নিয়ে কয়েক বছর আগেও আমি একই শিরোনামে আরও একটি লেখা লিখেছিলাম। আজকে আবারও যখন এই পথ নিয়ে লিখতে শুরু করলাম এই চেয়ে জুতসই নাম আসলে খুঁজেই পেলাম না বা মনে ধরলোনা আমার। তাই এই নামই সই, “কাপাসিয়ার মুগ্ধ পথে!”

তবে সেবার কাপাসিয়া গিয়েছিলাম সাইকেল চালিয়ে আর এই তো গত শনিবার গেলাম ড্রাইভ করে। তবে যে ভাবেই যাই না কেন? এই পথ আমাকে একইভাবে মুগ্ধ করেছে দুই বারের যাত্রা পথেই। সবচেয়ে অবাক যে ব্যাপারটা করেছে সেই কয়েক বছর আগের মতই একই রকম ঝাঁ চকচকে, মসৃণ, সবুজে মোড়ানো, জলের জড়ানো, নীলে আঁকা আছে এই পথ!

একই পথে কয়েক বছর পরে চলতে গিয়ে একই রকম অনুভুতিতে আচ্ছন্ন হওয়াটা যারপরনাই দুর্লভ মনে হয়েছে আমার কাছে। বিশেষ করে আমার দেশের যে কোন পথে কয়েক বছর পরে চলতে গিয়ে একই রকম অনুভূতি আমার আগে কখনো হয়নি। এবারই সেটার ব্যতিক্রম হল প্রথমবার। এবং সেটা সেই কাপাসিয়ার মুগ্ধ পথ সত্যি করে দেখিয়েছে।

রাজেন্দ্রপুর থেকে একটু ঘুরে ইউটার্ন নিয়ে কাপাসিয়ার দিকে ঘুরতে এই পথের মুগ্ধতা ছুঁয়ে যেতে শুরু করে। শালবন, সবুজ বনানী, সকালের মেঘলা আকাশ, একটু বৃষ্টি, মাঝে মাঝে দুই-পাশে জলাশয়, নানা রকম ইকো রিসোর্টের আহবান, চকচকে আকাশ, ঝিরিঝিরি বাতাস, শ্রাবনের মেঘ এই সবকিছুর মুগ্ধতা ছাপিয়ে গিয়েছিল এগিয়ে যেতে যেতে।

এই পথের বাঁক, মসৃণতা, প্রসস্ততা আর মোটামুটি ফাঁকা পেয়ে দারুন ছন্দে, চমৎকার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চ। যদিও এই রোমাঞ্চ মুখ থুবড়ে পরেছিলো, পাকুন্দিয়া থেকে নিকলি যেতে বাকি পথটুকুতে চলতে গিয়ে। প্রায় ৪২ কিলোমিটার পথ নাজেহাল করে ছেড়েছিল সেদিন নিকলি যেতে যেতে। কেমন ভাঙাচুরা, এবড়ো থেবড়ো, তেমনি সরু, সেই সাথে অটো রিক্সার উৎসব আর ছোট ছোট বাজার গুলোর অসহনীয় জটলা।

এসব ছাপিয়ে, কয়েকবার ভুল পথে গিয়ে যখন নিকলি হাওরের বেড়ি বাঁধে গিয়ে পৌছালাম, তখন দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি উবে গিয়েছিলো সত্যিই। সেই গল্প লিখবো একদম আলাদা করে। নইলে প্রান প্রাশান্তিতে ভরবেনা। আমি লিখি একান্ত আনন্দ আর প্রশান্তির জন্য, তাই জলে ভেসে চলার গল্পটা রয়েসয়ে লিখবো পরে। এখানে শুধু পথ চলার গল্পটা বলতে ইচ্ছে করছে।

হাওরের জলে ভেসে, হাওয়ায় উড়ে, মিঠামইনে মুগ্ধ হয়ে যখন আবার নিকলি বেড়ি বাঁধে ফিরি, ততক্ষনে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে রাত হয়ে গেছে। প্রায় রাত ৮ টা নাগাদ নতুন করে ড্রাইভ শুরু করলাম। গাড়ি ফুল প্যাকড। ভয় ছিলো, আসার সময়ের প্রায় ৪০ কিলোমিটার নাজেহাল পথ কিভাবে পাড়ি দেয়া যায় নিরাপদে আর পথ ভুল না করে, মোটামুটি সাবধানে আর পথ ভুল না করেই দেড় ঘণ্টায় এই বেহাল পথ পাড়ি দিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। আর এর পরেই শুরু হল এখন পর্যন্ত সেরা ড্রাইভিং রোমাঞ্চ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা।

পাকুন্দিয়া থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার মসৃণ, ঢেউ খেলানো আর আঁকাবাঁকা পথে রাতের আঁধারে ড্রাইভিং করার রোমাঞ্চ। যে পথের শুরুটাই হয়েছিলো ৭০+ কিলোমিটার গতি দিয়ে। এক একটা বাঁক আসে, আমি হেড লাইট লো বিমে দিয়ে, উল্টো দিক থেকে কোন যানবাহন আসছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু যখন বুঝতে পারি, কিছু আসছেনা, সামনে ফাঁকা, তখন ব্রেকের বদলে পা আবার এক্সিলেটরে চলে যায় অজান্তেই!

যে কারনে বাঁক গুলোও পেরিয়েছি ৭০+ গতিতে, তুলুম হেলেদুলে, শিহরিত হয়ে। মোটামুটি দুই একটা বাঁকে রাতের বাস ক্রস করা ছাড়া সব গুলো বাকেই এই রোমাঞ্চ উপভোগ করেছি আর নিজে নিজেই শিহরিত হয়েছি, পাশাপাশি নিজের কাছে নিজের আত্ন বিশ্বাস বেড়ে গেছে, সেই সাথে অভিজ্ঞতা আর স্পিডে চালিয়েই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল।

এমন পথে চালাতে চালাতে মনে হচ্ছিল এই পথে সারাদিন রাত অনায়াসে চলা যায় ক্লান্তিহীন ভাবে। শত শত কিলোমিটার! উফফ, নিকষ কালো রাত, মসৃণ আর ফাঁকা রাজপথ, ঢেউ খেলানো বাঁকানো বাঁক আর গতির ওঠানামা। সবকিছু মিলে একটা দুর্দান্ত ড্রাইভিং অভিজ্ঞতার স্বাদ নিয়েছি প্রান ভরে।

লেখকঃ সজল জাহিদ একজন ট্রাভেল ব্লগার দেশে বিদেশে পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে মিটিয়েছে ভ্রমণের সবাদ।ভ্রমন কাহিনী নিয়ে লিখেছেন বইঃ ভ্রমণ ভালোবেসে,পাপ্রল ড্রিম,অগোছালো শব্দ-কথা।

আমাদের সাথে থাকুন