
যেটুকু পুঁজি নিয়ে জিবিকা নির্বাহ করে চলছিলো বিলুপ্ত হতে চলা মৃৎ শিল্পরা। আজ তাদের পেশা নিয়ে পড়েছে এখন চরম হুমকির মুখে। এবারের করোনা মহামারীতে সারাদেশে হতে পারনি কোন প্রকার মেলা।অথচ চৈত্র বৈশাখ কে সামনে রেখে তাদের সারা বছরের প্রস্তুতি চলতে থাকে। মৃৎশিল্পী সবচেয়ে বড় আয়োজনটাই হয় চৈএ সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাকে ঘিরে। আর এই সময়ে জমে ওঠে মৃৎশিল্পীদের ব্যবসা। তাদের নিজের হাতে মাটি দিয়ে তৈরী খেলনা ও তৈজসপএ বিক্রির ধুম পড়ে য়ায়। অপরদিকে এই সময়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই বছরের বাকি সময় পাড় হয়ে যায় কুমারপাড়ার মৃৎ শিল্পীদের জীবন। অন্যদিকে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবার রমজান মাসে হালিম বিক্রিতে ব্যাবহৃত হতো মাটির পাত্র বা সানকি ব্যবহৃত হবার সুযোগ পায়নি। যার ফলে বছরের কোন ব্যবসায়িক সিজনকে ধরতে পারেনি এই হতভাগ্য মৃৎশিল্পীরা।
এই বছরের চৈএ ও বৈশাখী মেলার প্রস্ততি নিয়েছিলেন গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর ও কাপাসিয়ার প্রায় পাঁচ শতাধিকের বেশী মৃৎশিল্পী। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের পাল পাড়ার সুকুমার চন্দ্র পাল (৪৫) জানান, প্রতিবছরই আমরা চৈএ ও বৈশাখ মাসে ২০-৩০টি গ্রাম্য মেলায় অংশ নেই। এতে আমাদের ২-৩ লাখ টাকার ব্যবসা হয়। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে দেড় লাখ টাকার বেশি লাভ থাকে। সেই টাকা দিয়ে আমরা সারা বছরের সংসার খরচ চালাই।
অন্যদিকে,কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের টোক গ্রামের কুমাড় পাড়ার মৃৎশিল্পী প্রদীপ চন্দ্র পাল (৫৫) বলেন, বছরে প্রায় ১০ মাস আমাদের কোন ব্যবসা হয়না, তাই আমরা চৈএ ও বৈশাখ মাসের জন্য অপেক্ষা করি। কারণ এই দুই মাসে গ্রামে-গঞ্জে অনেক মেলা বসে। এসব মেলায় বিক্রি হয় মাটির তৈরি জিনিসপএ ও বিভিন্ন ধরণের মাটির তৈরি খেলনা। আমরা সাধারণত মেলা হওয়ার তিন-চার মাস আগে মাটির জিনিসপএ ও খেলনা তৈরি করে মেলার জন্য প্রস্তুতি নেই। কিন্তু মহামারী করোনার কারণে কোথাও বৈশাখী মেলা না হওয়াতে, আমাদের তৈরি এসব জিনিসগুলো আর বিক্রি হয়নি। তাই এখন আমরা আমাদের পুঁজি হারানোর শঙ্কায় আছি । দিন যতই পাড় হচ্ছে আমাদের জীবন ততই দূর্বিষহ হয়ে উঠছে। এখন আমাদের বেচেঁ থাকাটাই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও পরিবহন জনিত সমস্যার বিভিন্ন এলাকায় মাটির তৈরী জিনিষ পত্র নিয়ে যেতে না পারায় অবিক্রিত থেকে গেছে উৎপাদিত সব মালামাল।
তিনি আরো বলেন, এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে, আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। হাড়ি-পাতিলের ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। এমনিতেই প্লাস্টিকের বেড়াজালে মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল,খেলনা সবই হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক টাকা পুঁজি খাটিয়ে মাটির জিনিসপএ তৈরি করে ঘরে ফেলে রেখেছি, কোথাও কোন মেলা না হওয়ার কারণে। এখন আমাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। যেটুকু পুঁজি আছে সেই টুকুও হারানোর পথে। বাপ-দাদার এই শিল্পটা এখন আমাদের চোখের সামনেই ধ্বংস হওয়ার পথে। এই কষ্টের ঘানি আমাদের সারা বছরই টানতে হবে।
কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল কুমোর পাড়া গ্রামের রনজিত চন্দ্র পাল (৭৫) বলেন, এ উপজেলার আড়াল,কড়িহাতা,টোক,তরগাঁও,ঘোরশা
বিশেষ করে, চৈএ ও বৈশাখ মাসের আয়ের ওপর নির্ভর করে অনেকের বাড়িঘর মেরামত, মেয়ের বিয়ে দেওয়াসহ নানা রকম কাজ। অথচ এ বছর আমাদের আয় তো দূরের কথা, আমাদের পুঁজিই হারাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কড়িহাতা গ্রামের প্রমিলা রানী পাল (৪৫) বলেন, এ বছর ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে মাটির জিনিসপএ তৈরি করেছিলাম। এসস জিনিসপএ গুলো বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকা আয় হতো।
প্রমিলা রানী আরো বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে গ্রামে কোথাও মেলা বসেনি, তাই আমাদের মাটির তৈরি জিনিসপএ ও খেলনা সামগ্রী বিক্রি হয়নি। তিনি কথা বলার এক পর্যায়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন- ‘এই করোনার কারণে আমরা পুঁজিও হারালাম এবং আরো বেশি দরিদ্র হয়ে গেলাম’। আগামী দিনগুলোতে অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া পেশার মতো অনিশ্চিত অজানা ভবিষৎতের তাকিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে আর ভাবনায় শুধু জীবন জিবিকা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার নানান প্রশ্ন।