হঠাৎ করেই ফেসবুকে একটা নোটিফিকেশন।চেক করে দেখি আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক অবসরে গেছেন।
মেসেজটা দেখতে দেখতেই মোবাইলে একটা ফোন এলো। ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে বললো, দোস্ত! স্যার অবসরে চলে গেছেন তুই জানিস? তখন আমি বললাম হুম, আমি তো মেসেজটা পড়ে তাই দেখেছিলাম। অপর প্রন্তে সে আবার বললো- দোস্ত তোর খুব প্রিয় স্যার ছিলো। আমি তাকে বললাম, শুধু কি আমার প্রিয় ছিলো…?সে বললো নারে.. আমাদের এই কলেজের সবারই একজন প্রিয় মানুষ,প্রিয় স্যার, প্রিয় বন্ধু ছিলেন তিনি।
আজীবন স্যারের প্রতি মন থেকে শ্রদ্ধাবোধ থাকবে।
সে আমাকে বললো, পারলে প্রিয় শিক্ষক নিয়ে কিছু লিখে ফেল। কথাটা শুনেই আনন্দে আমার বুকটা ভরে উঠলো।যে মানুষটির শাসন, আদর আর ভালোবাসায় বটবৃক্ষের ছায়া পেয়েছিলাম তা সবাইকে জানানো উচিৎ।
কলেজ লাইফে পড়াশুনায় ভীষণ ফাঁকিবাজ ছিলাম। পড়তেই চাইতাম না। স্যার সব সময়ই আমাদেরকে বুঝাতেন। পড়াশোনা করলে জীবনে ভালো কিছু করা যাবে। কখনোই ভাবিনি? কেউ আমার প্রিয় শিক্ষক হতে পারেন।
এদিকে স্যারের সংস্পর্শে আসার পর পরই বুঝতে পারলাম, এমন একজন শিক্ষক পেয়ে গেছি, যাঁকে সারাজীবন শ্রদ্ধা করা যায়। যাঁর আদর্শে জীবন পরিচালনা করা যায়, যাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার স্পর্শে আগামী দিন ভালো কিছু করার প্রেরণা পাওয়া যায়।
মাত্র দুই বছর সৌভাগ্য হয়েছিল প্রিয় স্যারের সান্নিধ্য গ্রহণের। ভালো কথা, এখনো সেই প্রিয় মানুষটির নামই বলা হলো না। যাঁর কথা লিখেই যাচ্ছি। ওনার নাম বলাই কুমার দত্ত স্যার।
আমি খুবই সৌভাগ্যবান এই কারণে যে, আমার কলেজ লাইফের শিক্ষা জীবনে বেশ ভালো কিছু শিক্ষক পেয়েছিলাম। তাদের সকলের প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কেউ যদি বলে মাত্র একজন শিক্ষককে বাছাই করতে তাহলে সেটি আসলেই কঠিন কাজ। তবে আমার জীবনে যে সকল শিক্ষকের আদর্শ ও শিক্ষা খুব গভীরভাবে মনে ছাপ ফেলেছে তাদের মাঝে অন্যতম বলাই কুমার দত্ত স্যার।
প্রিয় স্যারের বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুরে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক। বাংলা সাহিত্যের একজন অসাধারণ প্রতিভাবান শিক্ষক ছিলেন বলাই স্যার। বলাই স্যার যখন ক্লাসে পড়াতেন সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ভীষন মনোযোগ থাকতো। এতই সুন্দর করে স্যার পড়াতেন যে তখন অন্য কোন দিকে চোখের দৃষ্টি যেত না। এক সময় স্যারের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সখ্য গড়ে উঠল। এখন বুঝতে পারি, স্যারের ছিলো বহুগুণ। সব সময়ই তিনি ছিলেন স্নেহপূর্ণ পিতা, আবার কখনো বন্ধু।
বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের নামে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গতাজ মহাবিদ্যালয়ে জীবনের ৩৬ বছর দিন মানুষ গড়ার কাজে ব্যয় করেছেন বলাই কুমার দত্ত স্যার। বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে বঙ্গতাজ কলেজে যোগ দেন ১৯৮৬ সালের ১৭ জুলাই তারিখে। হয়তোবা অনেক স্যারেরা অনেক সময় রাগী স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু বলাই স্যার তেমনটা ছিলেন না। উনি ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সর্বদা আন্তরিক। সবাইকে নিজের সন্তানের মতোই আদর করতেন। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে উনি আসলেই অতুলনীয়। একই সঙ্গে ছিলেন একজন সৎ চরিত্রের সহজ-সরল জীবনে বিশ্বাসী একজন মানুষ, যাকে দেখে ছাত্র-ছাত্রীরা নীতিবান হতে উৎসাহী হতো।
হেনরি এডামস এর একটি কথা আজ ভীষণ মনে পড়ছে, ‘শিক্ষকের প্রভাব অনন্তকালে গিয়েও শেষ হয় না’।
ছাত্র-ছাত্রীদেরকে খুব সহজভাবে বুঝাতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো স্যারের। তিনি ক্লাসে এমন ভাবে পড়া বুঝাতেন যে , সকল ছাত্র-ছাত্রীই ওনার ক্লাসে মুগ্ধ থাকতো।
জানিনা, আমার প্রিয় স্যারের কাছে আমার এই লেখাটি কখনো পৌঁছাবে কিনা।
স্যার, আজ আপনাকে একটা কথাই বলতে চাই। আপনাকে শুধু আমি না, লিমন তালুকদার,ইয়াসির আরাফাত পপি,মনির, শীতল,নূর মোহাম্মদ, রিমন, নাঈমা, রুপা, শিমু, মাওলাজ,শরীফ,রনীসহ আপনার আদরের ও স্নেহের সকল ছাত্র-ছাত্রীরা আমরা সবাই সত্যিই খুব ভালোবাসি। সামনা-সামনি হয়তোবা কখনো বলতে পারিনি কথাটা। কিন্তু আজ এ লেখার মাধ্যমে হয়তো জানিয়ে দিলাম নিজের সে না বলা কথাটা।
স্যার, আপনি যেখানেই থাকবেন, ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। সে প্রত্যাশায় আমরা আপনার দোয়ার ভিখারী।