ভ্রমণ নিয়ে আমার অদ্ভুত অদ্ভুত ইচ্ছের যেন কোন শেষ নেই। এই যেমন প্রথম যেবার কলকাতা হয়ে দিল্লী যাই, হাওড়া ব্রিজ পার হয়েছিলাম ট্যাক্সিতে করে। সেবার ট্যাক্সি করে হাওড়া ব্রিজ চোখে পড়ার পর থেকে নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি জানালার বাইরে মাথা বের করে হা করে তাকিয়ে ছিলাম স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন মনে মনে ঠিক করেছিলাম একদিন এই ব্রিজটা পায়ে হেটে পার হব। গঙ্গার বাতাস খাবো, নদীর মাঝখানে দাড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থাকবো।
এরপর, কত কতবার যে কলকাতায় গিয়েছি সেটা হিসেব করার জন্য পাসপোর্টের প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু তবুও কেন যেন কখনোই ছোট্ট, সাধ্যের মধ্যে কিন্তু অদ্ভুত এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারিনি, নানা কারনে। কখনো হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে তো কখনো নিচ দিয়ে গিয়েছি, এসেছি। কিন্তু নিজের মত করে হেটে হেটে উপভোগ করে ওঠার সময় কিছুতেই বের করতে পারিনি।
কিন্তু এবার শেষ একা ভ্রমণে এই সুযোগটা আমি কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইনি। যদিও নিজের ছোট্ট ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে ট্রেন মিস করার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম তবুও শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে অনেক দিনের লালিত ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছি। তবে এই ছোট্ট ইচ্ছে পূরণ করতেও অনেক রোমাঞ্চের মুখোমুখি হতে হয়েছিল সেদিন আর ইচ্ছে পূরণের পরেও ছিল টানটান উত্তেজনা কলকাতা স্টেশনে গিয়ে আমার পাটনা যাওয়ার গরীব রথ ট্রেন ধরতে পারবো কি পারবোনা এমন জটিল সমীকরণ। কারন…
খুব ভোরে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে তিন ঘণ্টা পারি দিয়ে চুপির চর বেড়িয়েছি, পাখির পৃথিবীতে একটা বেলা হেলে দুলে কাটিয়েছি। তারপর দুপুর ২ টায় চুপির চর থেকে ফিরে স্টেশন থেকে হাওড়ার ট্রেনে উঠে ঠিক তিন ঘণ্টা পরে বিকেল পাঁচটায় স্টেশনে নামি। তখনো আমার পরের পাটনা যাওয়ার ট্রেন প্রায় ৩ ঘণ্টা পরে রাত ৮ টায়। যে কোন যায়গা থেকে স্বাভাবিক সময়ে এক ঘণ্টার বেশী লাগবেনা কলকাতা স্টেশনে যেতে, সেখানে আমি দুই ঘণ্টা বরাদ্দ রাখার পরেও এক ঘণ্টা হাতে থেকে যাচ্ছে দেখে ভাবলাম, এই এক ঘণ্টা তাহলে হেটে হেটে হাওড়া ব্রিজ পার হবার ইচ্ছেটা পূরণ করে ফেলি। তো যে ভাবনা, সেই কাজ ভেবে স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাসে না উঠে ব্যাগটা কাঁধে আর মোবাইলটা হাতে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে।
শেষ শীতের ধূসর আকাশের নিচ দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার উপরে অবস্থিত পুরনো কিন্তু বনেদী হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে হেটে যেতে শুরু করলাম। শীতের একটা কনকনে বাতাস গায়ে এসে লাগতে লাগলো। নদী তীরে এমনিতেই বাতাস একটু থাকে, শীতের সময়ে যে বাতাসের ঠাণ্ডা অনুভূতি থাকে নদীতে সেই বাতাসের ঠাণ্ডার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। সেদিনও তেমনই হয়েছিল। উপরে মেঘলা আকাশ, নদীতে ধোঁয়া ওঠা কুয়াসা, কনকনে শীতের বাতাস আর হাওড়া ব্রিজের শত লোকের মাঝে ধীরে ধীরে হেটে যাওয়া। দুই এক ফোঁটা বৃষ্টিও পরছিল বোধয়। বেশ মজার একটা অভিজ্ঞতা। কলকাতার সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ড, হলুদ ট্যাক্সি, নীল সবুজ বাস, স্টিলের বিশাল স্থাপনার মাঝ দিয়ে হেটে যাওয়াটা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।
ব্রিজের একদম মাঝখানে গিয়ে মনে পড়লো, আরে ব্রিজের বা ব্রিজের মাঝখানে দাড়িয়ে কোন ছবি তো তোলা হলনা। ঝটপট ক্যামেরা বের করে দুই একটি ছবি তুলে ফেললাম। পথ চলতি এক পথিককে অনুরোধ করে নিজের একটি। যদিও খুব ভালো ছবি হয়নি, তবুও তো হল। হাঁটছিলাম, নদীর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, গায়ে বাতাস মাখছিলাম আর ভাবছিলাম, এই যে অনেকের কাছেই এই ব্রিজ হেটে পার হওয়াটা একটা অযথা সময় নষ্ট হবে হয়তো। কিন্তু আমার তো বেশ লাগছে, কাজ থেকে ঘরে ফিরে যাওয়া মানুষ দেখতে, বাসের জানালার পাশে বসে কানে হেড ফোন গুঁজে দিয়ে গান উপভোগ করা অপরিচিত মুখ দেখতে, ভিড়ের মাঝে ঝুলে বা দরজায় দাড়িয়ে থেকে নিজের আগামী দিনের কথা ভেবে যাওয়া উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে, ব্রিজের ফাঁকে ফাঁকে কালো কাঁক দেখতে, নদীতে বয়ে যাওয়া নৌকা দেখতে।
সবকিছুর দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মত করে দেখতে আর উপভোগ করতে দারুণ লাগছিল। এসব দেখতে দেখতে কখন যেন ব্রিজ পেরিয়ে মূল সড়কের ভেজা ভেজা পথে পা বাড়িয়েছি বুঝতেই পারিনি। এটা বুঝতে পেরে ঘড়ির দিকে তাকাতেই মনে পড়লো আরে হাতে তো মাত্র দুই ঘণ্টা সময় আছে। নিউমার্কেট এলাকায় হোটেলে গিয়ে ব্যাগপত্র অন্য হোটেলে রেখে আমাকে তো সেই চিতপুর যেতে হবে, পাটনার ট্রেন ধরতে। যেখানে যেতেই অন্তত এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগবে আর গিয়ে একটু ফ্রেস হয়ে ট্রেনে উঠতে আরও আধা ঘণ্টা! তার মানে দুই ঘণ্টার কাজ তো বাকি-ই আছে! তাহলে এখন কিভাবে সময় কভার করে স্টেশনে পৌছাবো পাটনার ট্রেন ধরতে পারবো তো নিউমার্কেট গিয়ে সেখান থেকে?
মহা মুশকিলে পরে গেলাম তো হাওড়া ব্রিজ হেটে হেটে উপভোগ করতে গিয়ে! দুই দুইটা এসি থ্রি টায়ার এর টিকেট কাটা আছে পাটনা যাওয়া আসার। ট্রেন মিস হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে আর সেই সাথে আমার নতুন আর একটা রাজ্য দেখার ইচ্ছারও বারোটা বেজে যাবে!
এরপরই শুরু হল, নতুন এক রোমাঞ্চ, বাস-ট্রেন-মেট্রো আর দৌড়ের গল্প…
