ঢাকা সোমবার, জুন ১, ২০২৬

শিবলিঙ্গ ও থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া মুহূর্তে-সজল জাহিদ

যে কোন ভ্রমণে আমার একটা বিশেষ সৌভাগ্য হল, যত রাতেই ঘুমাই না কেন, খুব খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। যে কারনে ভ্রমণের প্রতিটি দিনই আমার কাছে অনেক প্রাপ্তির হয়ে ধরা দেয় লম্বা সময় হাতে পাওয়ার কারনে। কারন, আমি মনে করি ঘুমোতে তো আসিনি, এসেছি-ই তো দেখতে, ছুঁতে, হৃদয় দিয়ে অনুভব আর প্রান ভরে উপভোগ করতে। তাই যতটা পারি দুচোখ ভরে দেখে নেয়া যায়, কাছে-দূরে, আশে-পাশে, আকাশে-বাতাসে, গাছে-গাছে, লতায়-পাতায়, নদীতে-মাঠে-ঘাটে। তাই আমার প্রাপ্তির খাতাটাও ভরে ওঠে কানায় কানায়। এবং শেষ পর্যন্ত কোন ভ্রমণ নিয়েই আমার তেমন কোন আক্ষেপ বা অপূর্ণতা থাকেনা। তো সেদিনও তেমনই হয়েছিল।

আগের দিন শেষ বিকেলে পৌঁছেছি অনেক দিনের লালন করা গোমুখের বেজক্যাম্প ভুজবাসায়।রাতে রুপালী নদীর রূপের স্রোত দেখে এসে সুখের নিদ্রা নিয়েছিলাম আমাদের সবুজ তাবুর ভিতরের মোটা মোটা দুই লেপের মাঝে। উহ, কি যে শীত ছিল বলে বোঝানো মুশকিল। শুধু বিছানাটা একটু গরম হতেই এক ঘণ্টার বেশী লেগেছিল। তাও বিছানার এক পাশ একটু গরম হয় তো অন্যপাশ হিম হিম ঠাণ্ডা। যেন বরফের জল ছিটিয়ে রেখেছিল কেউ! অনেকটা সময় ঘুমে জাগরণে থাকার পরে একটা সময় ঘুমে তলিয়ে গেলাম। কিন্তু মধ্যরাতে ভীষণ বিপদে পরেছিলাম প্রাকৃতিক ডাকের চাপে। যে বিড়ম্বনার গল্পটা কখনোই বলা হবেনা বোধয়!

আবারো ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙে তখনো বাইরের আলো ফোটেনি, তাবুর ভিতর থেকে মোটা ডাবল লেপের ভিতর থেকে মুখ বের করে টিপটিপ করে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। একটু ভাবলাম, আবার কি ডুব দেব উষ্ণ লেপের তলায়? নাকি বাইরে বের হব অপার্থিব কিছু দেখার আশায়? এতো বেশী ঠাণ্ডা ছিল যে কয়েক মুহূর্ত ভাবতেই হল, নিজের সাথেই নিজেকে একটু বোঝাপড়া করতে হল। শেষমেশ বাইরে একটু মানুষের আনাগোনা টের পেলাম বোধয়। তাই একটু কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত বুট পরে, জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বের হলাম।

বাইরে বের হয়েই দেখি একটি ট্রেক টিম গোমুখ যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আমিও আর দেরি না করে ঝটপট রেডি হতে গেলাম। আগের রাতেই আমার দুই তাবু সঙ্গীর সাথে কথা পাকা হয়ে গেছে যে ওনারা আজকে আর গোমুখ গেলেও গাঙ্গোত্রী ফিরে যাবেনা। অনেক কষ্ট হয়েছে দিনে। তাই আজকে গোমুখ থেকে ফিরে, রেস্ট করে কাল সকালে ফেরার পথ ধরবেন। যে কারনে আজ আমি আরও একা, কারো জন্যই অপেক্ষা করতে হবেনা। নিজের মত করে গোমুখ গিয়ে, নিজের মত করে ফিরে আসা যাবে। চূড়ান্ত ট্রেক এর প্রস্তুতি নিয়ে, ওনাদেরকে বিদায় জানিয়ে তাবুর বাইরে বেরিয়ে পরলাম।

বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম তা কিভাবে আর কোন ভাষায় প্রকাশ করলে যে সঠিক হবে সে ভাষা আমার জানা নেই! শুধু হা করে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে, পাহাড়ের দিকে, সূর্য রশ্নির বিপরিত দিকে। এমন আকাশ, এমন পাহাড়, এমন রোদের মহিমা, এমন আলো আর এমন কিছু আমি আগে কোনদিন দেখিনি। এমন সোনায় মোড়ানো সবকিছু এই জীবনে প্রথমবার দেখালাম। আগের রাতে আকাশে-আকাশে, পাথরের পাহাড়ের মাথার উপরে যে রুপালী পাহাড়ের চূড়া দেখেছিলাম, আজ সেগুলো আগের রাতের চেয়েও দামী, দুর্লভ আর অমুল্য হয়ে ধরা দিয়েছে।

কারন পুরো সাদা পাহাড়ের যতগুলো চূড়ার যেখানে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তার সবগুলোই সোনা হয়ে গেছে! আগের রাতেই যারা রুপা ছিল, সকালে তারা সোনা হয়ে গেছে! কি অসম্ভব, কিন্তু একদম সত্যি! চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সোনার পাহাড়, সোনালী চূড়া আর সোনায় মোড়ানো পর্বতমালা! আমি কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গিয়েছিলাম কি করবো আর কি করবোনা ভেবে।

তাকিয়ে থাকবো, নাকি ছবি তুলবো, নাকি ভিডিও করবো? মোবাইল বের করবো না ক্যামেরা দিয়ে ক্লিক করবো? এই সময়, হ্যাঁ শুধুমাত্র এই সময়টাতেই নিজেকে বড় অসহায় লাগছিল একা-একা ট্রেক করতে আসায় একটা আফসোস হচ্ছিল। কারন এই সোনার পাহাড়ের সাথে কোন ছবি তোলা হলনা আমার! একটা কি ভীষণ আক্ষেপ, একটা কষ্ট আর কিছুটা অসহায়ত্ব বুকে চেপে রেখেই ক্যামেরা বের করে সোনার পাহাড়ের ছবি তুলে রাখলাম কিছু।

এদিকে চারদিকের পাহাড়ে পাহাড়ে সূর্যের প্রথম আলো পরে পুরো পাহাড় যেন সোনায় মুড়ে যেতে শুরু করলো। শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের চূড়াগুলো তার সোনারঙ বদলে নানা রঙের খেলায় মেতে উঠতে শুরু করলো। কোন পাহাড়ের চূড়া হালকা গোলাপি হয়ে ধরা দিচ্ছে, তো কোন পাহাড়ের চূড়া লাল রঙে রেঙে উঠছে ধীরে ধীরে। কোথাও পাহাড়ের সারি রঙধনু রঙ ঢেলে দিচ্ছে সূর্যের কাছে রঙ ধার করে। আর সেই সাথে চারদিকের যত পাহাড় সব যেন সোনায় সোনায় মুড়িয়ে নিচ্ছে নিজেকে। যতদূর চোখে যায় সব পাহাড়ে যেন সোনা ছড়িয়ে দিয়েছে সকালের সোনালী সূর্যের আভা।

আর দেরি না করে সোনায় মোড়ানো পাহাড় সারির মাঝ দিয়েই চলতে শুরু করেছিলাম গোমুখের পথে। চার কিলোমিটার পাহাড়ি ট্রেইলে ট্রেক করতে হবে। ভিন্ন মতে ৬ কিলোমিটার। আমার, আমাদের আজকের আর এই ট্রেকের শেষ আর আসল গন্তব্য। গোমুখ। সোনায় মোড়ানো পথে, সোনায় মোড়ানো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, এক সোনা ছড়ানো সকালে ট্রেক করে চলেছি আর এক সোনায় মোড়ানো পাহাড়ের পাদদেশে যাবো বলে। ভাগীরথী পিক, গ্রুপের কাছে। যে গ্রুপের বরফ গলা গ্লেসিয়ার থেকে গঙ্গা নদীর উৎপত্তি। সে গোমুখের সন্ধানে, দর্শনে।

সামনে আকাশের দিকে যতদূর চোখ যায়, সবই সোনায় মোড়ানো পাহাড় চূড়া, ভাগীরথী পিক, শিবলিঙ্গসহ আসেপাশে আর পিছনেও সকালের সোনা রোদ গায়ে মেখে দাড়িয়ে আছে সোনার পাহাড়, সোনায় সোনায় মোড়ানো চূড়া নিয়ে। আকুল আর ব্যাকুল করে দিয়ে সবাইকে।

সেই সোনার সকালে সোনার পাহাড় দেখতে দেখতে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম গোমুখের দিকে। হিম হিম শীত আর কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় সোনা ঝরা উষ্ণ রোদের পরশ গায়ে মেখে মেখে। আগেই বলা হয়েছে যে প্রাথমিক তথ্যমতে ভুজবাসা থেকে গোমুখের দুরত্ত জানা ছিল চার কিলোমিটার। শুধু আমার নয়, এই সকালে আমি যে টিমের পিছু নিয়েছিলাম তারাও তেমন জানে আর তাদের গাইডরাও সেরকম তথ্যই সবাইকে দিয়েছে বা জানিয়েছে।

ভুজাবাসা থেকে গোমুখের চার কিলোমিটার পর্যন্ত খুব কঠিন কোন ট্রেইল ব ট্রেক নেই এটা জানা ছিল। নেই তেমন ঝুঁকিপূর্ণ কোন বাঁক বা পাহাড়ে চড়াই অথবা নেই ঝুরো মাটি বা পাথরের পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে যাওয়ার মত শুষ্ক কিন্তু পিচ্ছিল কোন ট্রেক।

এই পথে চলতে চলতে সামনে ধূসর সাদা পাহাড় সারির দিকে হাঁটছিলাম। একে একে তিনটি চুড়া একটু একটু করে সামনে এগিয়ে আসছে বা আমরা ওদের পায়ের কাছে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ওই তিনটি চুড়াকে একসাথে ভাগীরথী গ্রুপ বলা হয়। যে পাহাড়ের বরফ গলেই গোমুখ বা গঙ্গার উৎপত্তি বলে কথিত আছে বা ধরে নেয়া হয়। ওদিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম এই তো আর দুই বা তিন কিলোমিটার পরেই তো ওদের কাছে পৌঁছে যাবো। এই সুখ ভাবনা নিয়ে হাটতে হাটতেই একটা সময় দেখি আমাদের ঠিক সামনে একটা বেশ বড় পাথর বা পাহাড়ের ক্ষয়ে যাওয়া অংশ বিশাল একটা স্তম্ভ হয়ে দাড়িয়ে আছে। যার ঠিক শীর্ষেই মাথা তুলে সকালের প্রথম আলোর পরশ মেখে মিটমিট করে হাসছে শিবলিঙ্গ।

ঠিক ওই পাহাড়ের দাড়িয়ে থাকা স্তম্ভ দেখলাম আর দেখলাম তার উপরে শিবলিঙ্গ এর পরের ঘটনাটুকু ঘটে গেল মুহূর্তেই। তখন আমি আর আমার মাঝে ছিলাম না নিশ্চিতভাবেই। বোধশুন্য হয়ে, অন্য কোন কিছু না ভেবেই এক দৌড়ে উঠে গেলাম সেই পাথরের স্তম্ভ বা ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের অংশ বিশেষে যা ঠায় দাড়িয়ে আছে শিবলিঙ্গকে মাথায় করে। শুধু এইটুকু মনে আছে যে ওই পাহাড় বা পাহাড়ের অংশ বিশেষ বা বিশাল দাড়িয়ে থাকা পাথরের চুড়ায় দৌড়ে ওঠার আগে একজনকে আমার ক্যামেরাটা দিয়ে বলে ছিলাম প্লিজ ক্লিক সাম ফটো। এরপর আমি শীর্ষে!

আহ কি যে এক শিহরিত অনুভূতি ভাষায় ব্যাক্ত করার মত নয়। পাথরের শীর্ষে আবার দারুণ বসার মত কিছু যায়গাও পেয়ে গেলাম। আগে কিছুক্ষণ পাগলামি করলাম, নেচে-গেয়ে, নিজের মত করে উদযাপন করে নিলাম উচ্ছ্বসিত অনুভূতির সাথে। তারপর কিছুটা সময় বসে বসে শিবলিঙ্গ দেখলাম অপলক তাকিয়ে। সূর্যের আলোর কমা-বাড়ার সাথে সাথে তার রূপের পরিবর্তন ঘটছিল একটু পরপর। সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম আর নিজেকে নিজের এমন সৌভাগ্যের জন্য বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছিলাম মনে মনে।

এরই মাঝে কখন যেন, আমার দেখাদেখি আর্জেন্টাইন দুইজন সেই চুড়ায় উঠে এসেছে নিজেদেরকে ধরে রাখতে না পেরে। ওদের মধ্যেও আমার মত আবেগের সংক্রামণ দেখে অবাক আর অভিভূত দুই-ই হলাম। অবশেষে ওদের গাইডের অনুরোধে ওদেরসহ আমাকেও নেমে আসতে হল। তবে সেই পাহাড় বা বিশাল পাথরের চুড়া থেকে নেমে আসাটা ওঠার মত অতটা সহজ সাধ্য ছিলনা মোটেই। নেমে আসাটা ছিল বেশ কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ। কারন দারুণ উত্তেজনায় আর বেখেয়ালে এক দৌড়ে উঠে গেলেও নামতে নিতে হয়েছিল দুই এক জনের সাহায্য। এতটাই খাড়া ছিল যে একটু পা হড়কালেই নদীতে সমর্পিত, সেও পানিতে নয় জেগে থাকা রাক্ষুসে পাথরের উপরে। যার পরিণাম? গা শিউরে ওঠার মত।

তবে নেমে আসার পরেই আমার আর আমার সাথে আর যে দুই একজন উঠেছিল সেই ছোট্ট চুড়ায়, ধবধবে সাদা, নরম কোমল তুষার জড়ানো শিবলিঙ্গ পেয়েছিল যেন হাত ছোঁয়া দুরত্তে, তারা কেউই সেই মুহূর্তে সেখান থেকে যেতে চাইছিলনা। থমকে দাড়িয়ে ছিলাম সেই পাথর বা পাহাড়ের পায়ের কাছে। আর যখন অন্যদের দূরে চলে যাওয়া দেখে পথ চলতে শুরু করেছিলাম, তখন বারবার করে পিছনে ফিরে ফিরে চাইছিলাম।

সোনা ছড়ানো সুখ সকালে, সোনার পাহাড় দেখে, সোনা রোদে উষ্ণ হয়ে যে পাহাড়ের চুড়ায় ওঠার অদ্ভুত এক সোনালি স্বাদ পেয়েছিলাম। যে সময়টা, যে মুহূর্তগুলো, যে পাহাড়ের চুড়ায় ওঠা, বসে থাকা, উচ্ছ্বসিত হওয়া, সে যে ভোলার নয়। চোখ বুজলেই যেন সেই মুহূর্ত গুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে, এক সোনালি সকালে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজান্তেই।

সেই বরফ মোড়ানো শিবলিঙ্গ আর তার সাথে পাহাড়ের এক চুড়ায় কাটানো সোনালী সকালের মুহূর্তটুকু যেন স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে, চিন্তায়, চেতনায়, ভাবনায়, স্বপ্নে আর কল্পনায়।