ঢাকা শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬

ভীষণ প্রশান্তির একটা যায়গা শান্তিনিকেতন -সজল জাহিদ

শান্তিনিকেতন আমার কাছে ভীষণ প্রশান্তির একটা যায়গা। আমি মাত্র দুইবার শান্তিনিকেতন গিয়েছি। দুইবারই শান্তিনিকেতন আমাকে দিয়েছে ভীষণ ভীষণ প্রশান্তি। ঠিক কি কারনে এতটা প্রশান্তি অনুভব করেছি জানিনা, রবীন্দ্রনাথ? তার সাহিত্য? গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা গান? নাকি শান্তিনিকেতনের বনেদী ইতিহাস ও ঐতিহ্য? হবে হয়তো এই সবকিছুর সম্মিলিত কারন। তবে, হ্যাঁ পুরো শান্তিনিকেতনের যে যায়গাটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, যে যায়গাটা আমাকে ছুঁয়ে গেছে, যে যায়গাটা আমাকে ভীষণ আবেগে আবিলুপ্ত করেছে, সেটা শান্তিনিকেতনের বিশেষ একটা যায়গা। যে যায়গাটার নাম…

“বকুল বীথি” আমার কাছে যেটা “বকুল বীথির ছায়া” কারন বকুল বীথিতে আমি যখন পৌছাই তখন সূর্য পুরোপুরি পশ্চিম আকাশে হেলে পরে গাছগাছালির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে আলতো আলোর একটা আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল শুধুমাত্র, আর সেই সময়ে পুরো বকুল বীথি ঢেকে ছিল চারপাশের বকুল আর অন্যন্য গাছের বেশ গাড় ছায়ায়। হেটে হেটে ভীষণ ক্লান্ত আমি টুকরো ছায়া খুঁজে পেয়েছিলাম এই বকুল বীথির ছায়ায়, একদণ্ড প্রাশান্তি খুঁজে পেয়েছিলাম এখানে, কিছুটা সময় বসে বসে বিশ্রাম নিয়েছিলাম এই বকুল বীথির ছায়ায়।

এ কারনেই কিনা জানিনা, পুরো শান্তিনিকেতনের যতটা পায়ে হেটে ঘুরে বেড়িয়েছি, দেখেছি, হৃদয় দিয়ে ছুঁয়েছি আর একান্তে অনুভব করেছি, সেই সব যায়গার মধ্যে এই বকুল বীথি আর সেই বকুল বীথির প্রশান্তি জড়িয়ে দেয়া ছায়াময় প্রাঙ্গণ আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সবচেয়ে বেশী করে কেন যেন আপন মনে হয়েছে। কেন যেন অনেক দূরে চলে আসার পরেও বকুল বীথির ছায়া আমাকে একটা অদ্ভুত বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে। কলকাতা আর শান্তিনিকেতনের কথা মনে পড়লেই কেন যেন আমার সবার আগে মনে পরে যায় প্রিয় বকুল বীথি আর তার মায়াবী ছায়া দিয়ে আপন করে নেয়া সেই শেষ বিকেলের কথা। যা আমার সুখ স্মৃতির এ্যালবামে একটা বিশেষ ছবি হয়ে আছে।

তবে ফিরে আসার পরে প্রিয় বকুল বীথি নিয়ে একটা আফসোসে পুড়েছি মনে মনে। তার কারন হল, বকুল বীথিতে যখন গিয়েছি তখন গাছে কোন ফুল ছিলোনা, পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে কোথাও ঝরে পরা অজস্র সাদা সাদা, পাগল করে গন্ধ ছড়ানো বকুলের গালিচা ছিলোনা। সেই সময়টা হয়তো বকুলের ছিলোনা বলে। তাই ফিরে আসার পরে আমার কিছুটা আক্ষেপ হয়েছে আর এখনো সেটা রয়েগেছে। প্রিয় বকুল বীথির ছায়ায়, বকুলের ঘ্রাণ, বকুলের সম্ভাষণ আর বকুলের পরশ না পাওয়া। আরও একটা প্রিয় মুহূর্তের অভাব বোধ করি খুব প্রিয় বকুল বীথিকে নিয়ে আর সেটা হল ভীষণ ঝমঝমে বৃষ্টির মাঝে বকুল বীথির প্রাঙ্গণে হেটে বেড়ানো।

তাই ভাবছি একবার শান্তিনিকেতনে যেতে হবে, সাথে করে আমার কাল্পনিক প্রেমিকাকে নিয়ে, যার বকুলের পাগল করা গন্ধটা খুব বেশী প্রিয়, যে বকুল ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথতে ভীষণ পছন্দ করে লাল রঙের সুতোর দিয়ে, যে মালা সে তার দীর্ঘ কালো চুল গুলোকে আমার প্রিয় খোঁপা তৈরি করে সেই খোঁপায় পড়িয়ে দিতে বলবে আমাকে। তারপর আমাকে বাম হাতে জড়িয়ে দেবে এক জোড়া বকুল ফুলের মাদকতামত গন্ধ ছড়ানো মালা।

কিন্তু তাকে নিয়ে যখন যাবো তখনো হয়তো গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়ার সময় হয়ে ওঠেনি। গাছে ফুল আছে ফুটে, সবুজ গাছের পাতা গুলো অজস্র বকুলের ব্যঞ্জনায় সাদা হয়ে গেছে, শুধু একটু বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া বা দমকা বাতাসের অপেক্ষায় আছে, যেন ঝরে ঝরে পড়তে পারে, গাছের ছায়ায়, ঘাসে, মাটিতে আর ধুলো ওড়া পথে পথে।

কোন এক অলস দুপুরে ঘুম থেকে উঠে সে, টকটকে লাল শাড়ি পড়বে, একটা হালকা হলুদ শাল গায়ে জড়াবে, আমাকে দেবে একটা কালো রঙের পাঞ্জাবী, জিন্সের উপরে কালো পাঞ্জাবী পরে সে আর আমি হাতে হাত রেখে হেটে হেটে পৌঁছে যাবো বকুল বীথির ছায়ায়। সে ফুল কুড়াবে, মালা গাঁথবে, আমার হাতে জড়াবে আর আমি তার খোঁপায় জড়িয়ে দেব। কিন্তু ফুল যে ঝরে পরা শুরু হয়নি তখনো, হতাশ হয়ে গাছের দিকে তাকিয়ে থাকবে ফুলের আর গন্ধ ছড়ানো অজস্র বকুল ফুলের দিকে।

লাল শাড়ি আর হলুদ শাল জড়িয়ে, অভিমানী চোখে আমার দিকে তাকাতেই দেখবে আমি নেই পাশে! মনটা মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গিয়ে কাঠ গোপালের মত কোমল মুখ, আষাঢ়ের মত কালো হয়ে গিয়ে, দুই চোখে টলটলে অশ্রু নিয়ে আবারো গাছের ডালের ফুল গুলোর দিকে তাকাতেই, বকুলের ডাল নেচে উঠবে তার মাথার উপরে দাড়িয়ে থাকা ফুলে ফুলে ভরা বকুলের থোকা, ঝরে পড়তে শুরু করবে হাজারো সাদা সাদা বকুল ফুল, তার মাথায়, চুলে, চোখে, কপালে, গালে, গলায়। একটি একটি ফুল ঝরে পড়বে আর সে শিহরিত হয়ে উঠবে। আমি তখন বকুল গাছের ডালে উঠে ডাল ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে তাকে বকুল ফুলের বৃষ্টি দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছি। তাই দেখে, সুখে, আনন্দে, আবেগে তার দুচোখ দিয়ে গাল বেঁয়ে ঝরে পড়তে শুরু করবে সুখের অশ্রু।

কেমন হবে সেই দিনটি, সেই সকাল যেদিন সে লাল শাড়ি আর হলুদ শাল জড়িয়ে দাড়িয়ে থাকবে বকুল বীথির ছায়ায়, আর আমি গাছের ডালে দাড়িয়ে দুলে দুলে অজস্র বকুল ঝরিয়ে দেব তার গায়ে, পায়ে, লাল শাড়িতে, হলুদ শালে, পুরো শান্তিনিকেতনে? কেমন হবে সেই ফুলের বৃষ্টি ঝরা সকালটাতে? কতটা আকুল হবে সে আমার কাছে, কতটা ব্যাকুল হবে বকুল বীথির ছায়ায় বসে, বকুলের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার মাঝে হারিয়ে যেতে!

ইস, কবে আসবে সেই সকাল, কবে ফুঁটবে অজস্র বকুল ফুল, কবে যাবো শান্তিনিকেতনে, কবে ঝরাবো ফুলের বৃষ্টি, কবে মেটাবো হৃদয়ের এই তৃষ্ণা? কবে সত্য হবে আমার এই কল্পনা? প্রিয় বকুল বীথির ছায়ায়…?