মুক্তেশ্বর থেকে গাড়ি চলতে শুরু করার পরে আমাদের প্রথম চাহিদা ছিল দুপুরের খাবার। কিন্তু দীর্ঘ এক ঘণ্টা চলার পরেও পথে কোন পছন্দমত খাবারের দোকান চোখে পড়েনি। আর যে যায়গা থেকে সকালের খাবার নিয়েছিলাম সেই যায়গা কারো পছন্দের ছিলোনা, ধুলো ধূসরিত এলাকা বলে। যে কারনে ড্রাইভার পরামর্শ দিল আমাদের পরবর্তী গন্ত্যব্য ভীমতালে গিয়ে লাঞ্চ করার। জিজ্ঞাসা করে জানলাম ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যেই ভীমতাল পৌঁছে যাবো যে পথটুকু বাকি আছে।
কিন্তু যাবার সময় দীর্ঘ সময় লাগলেও এখন অতটা সময় লাগবেনা তার কারন হল, যখন গিয়েছি তখন আমরা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় বেশিরভাগ সময়ই উপরের দিকে উঠেছি যেটার জন্য সময় বেশী লেগেছে। আর এখন অধিকাংশ সময়ই আমরা নিচের দিকে নামছি বলে সময় অনেক কম লাগবে। বাকি পথটুকু প্রায় সবাই-ই কম বেশী ঘুমিয়ে কাটিয়েছি একে একে। ৩০ মিনিটের মধ্যেই ঘন ঘন বেশ কয়েকটি বাঁক নিয়ে গাড়ি আরও নিচের দিকে নামতে শুরু করতেই সবার ঘুম ভেঙে গেল।
ততক্ষণে আমাদের জন্য আজকের একেবারেই অন্য রকম উচ্ছ্বাস অপেক্ষা করছিল। ভীমতাল নাম শুনেছি কিন্তু সেটা যে এতোটা উচ্ছ্বসিত হওয়ার মত কিছু হবে সেই ধারনা আমাদের কারোই ছিলোনা। কারন হল, যতই পাহাড় ভালোবাসিনা কেন, সেই পাহাড়ে গিয়ে যদি একটু ঝর্ণা, ছোট্ট কোন বহমান নদী, টলটলে কোন জলাশয় দেখি বা পেয়ে যাই তাহলে পাহাড়ে যাওয়ার আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে যায় আমাদের। আর সেখানে যদি হয় চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়ের ভ্যালীতে ঝলমলে আলো ছড়ানো, টলটলে জলের, অপূর্ব আর অবাক করা এক লেক, তাহলে তো কথাই নেই। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর আবেগ যেন তখন বাঁধন হারা হয়ে যায়।
আমাদেরও তেমনই হয়েছিল, যখন সবাই চোখ খোলার পরে, পাহাড়ের শেষ বাঁক নিয়ে সমতলে নেমে আসার পরে ড্রাইভার বলল ভীমতাল আগায়া। ডানে তাকিয়ে দেখি যে এক অপরূপ সুন্দরী ঝলমলে হাসি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে তার রূপের দারুন সুধা ঢেলে, অদ্ভুত আকর্ষণ নিয়ে আমাদের তার কাছে টেনে নিচ্ছে। তাকে দেখে সবার মুখেই হাসির ঝিলিক দিয়ে উঠে সারাদিনের ক্ষুধা যেন কোথায় উধাও হয়ে গেল নিমিষেই!
এমনই হয় মাঝে মাঝে। যখন আমরা প্রত্যাশার চেয়ে বেশী কিছু হুট করেই পেয়ে যাই, আনন্দে আর উচ্ছ্বাসে তখন স্বাভাবিক অনেক চাওয়া পাওয়াই সাময়িক সময়ের জন্য ভুলে যাই। এই যেমন হুট করেই ভীমতালে প্রবেশ করেই এমন অবাক করা সৌন্দর্য দেখে সবাই অনেকক্ষণ থেকে ক্ষুধা অনুভব করা সেই ক্ষুধাটা উধাও হয়ে গেল, তেমন করেই। কেনই বা নয়? কারন ভীমতাল নাম শুনে আমরা মনে করেছিলাম পাহাড় বা পাহাড়ের আশেপাশে ধর্মীয় কোন স্থাপনা বা উপাসনালয় হবে হয়তো বা এমন ধরনের কোন কিছু।
কিন্তু আমাদের সকল ধারনাকে ভুল প্রমাণিত করে দেখি চারপাশেই পাহাড়ে পাহাড়ে ঘিরে থাকা এক ভ্যালীতে বিশাল, বিশাল এক লেক। যেটা নৈনিতালের লেকের চেয়েও অনেক অনেক বড়, অনেক বেশী সুন্দর, অনেক বেশী আকর্ষণীয় আর অনেক বেশী অবাক করা। নৈনিতাল লেকের তো দু-এক যায়গায় কিছুটা রুক্ষ প্রকৃতিও চোখে পড়েছে, কিছু কিছু যায়গায় একটু অপরিচ্ছন্নও লেগেছে, কিন্তু এই ভীমতালের লেক একদমই অন্যরকম, পুরোটাই স্বচ্ছ, ঝকঝকে পরিস্কার কাঁচের মত। যেন পাহাড়ি ভ্যালীতে বিধাতার এক অবাক উপহার।
প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা, আঁকাবাঁকা লেকে শতশত রাজহাঁসের সাতার, জলকেলি, ভেসে চলা, ডুবে থাকার ইচ্ছেমত স্বাধীনতার সুখ উপভোগ করার উপভোগ্য দৃশ্য। ঘাঁটে ঘাঁটে বাঁধা সব রকমের রঙের রঙিন রঙিন ডিঙি নৌকা গুলো বর্ণীল করে রেখেছে পুরো লেকের টলটলে ঝলের ঢেউ, লেকের চারপাশের পাহাড়ে পাহাড়ে নান্দনিক ঘর বাড়ির হাসি হাসি মুখ করে থাকা আর এই লেকের সবচেয়ে বড় যে চমক সেটা হল লেকের ঠিক মাঝখানে একখণ্ড সবুজ ভুমি বা একটি সবুজ আইল্যান্ড! নানা রকম গাছে গাছে সুশোভিত আইল্যান্ডের মাঝখানে ছোট্ট একটি বাড়ি, ঘাঁটে বাঁধা একটি নৌকা, যার চারপাশ দিয়ে ভেসে চলেছে অগণিত রঙিন ডিঙি নৌকা। দেখেই একটা ভীষণ প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেল। বাকি ইচ্ছেটুকু না হয় নিজের কাছেই রেখে দেই আগামীর জন্য।
অনেকটা সময় লেকের সিঁড়িতে, ঘাঁটে বেঁধে রাখা রঙিন ডিঙি নৌকায়, গাছের ছায়ায় বসে থেকে, হালকা কিছু খেয়ে, চা হাতে করে উঠে গেলাম লেকের অন্যপাশে বাঁধের উপরে। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। দুপুরের তপ্ত রোদ মিষ্টি পরশ বোলাতে শুরু করেছে। লেকের উপরে চমৎকার একটি বাঁধ, যে বাঁধ দিয়ে লেকের এক পাড়ের মানুষজন অন্যপাড়ে যেতে পারে হেটে হেটে তাদের আবাসে, হোটেলে বা মোটেলে। বাঁধের উপরেই রয়েছে দারুন দারুন বসার যায়গা পর্যটক বা যে কারো জন্য। আর লেকের সেই বাঁধের সাথেই রয়েছে লেকের উপরেই ঝুলে পড়া একটি খোলা বারান্দা, রেলিং আর বসার জন্য পাথরের বেদী।
সবকিছু মিলে অবাক কিছু সময় কেটেছিল সবার দারুন আনন্দে, অসীম উচ্ছ্বাসে, শতশত মনের মত ছবি তুলে, হাসিতে, আনন্দে আর উপভোগে। একই সাথে পেয়ে এমন অবাক করা রূপের পাহাড় ঘেরা বিসৃত টলটলে জলের লেক, মেঘমুক্ত নীল আকাশ, লেকের জলে ভেসে বেড়ানো চঞ্চল আর মুক্ত রাজহাসের দল, রঙিন রঙিন নৌকার দোলা, মৃদু ঢেউ, অবাক আইল্যান্ড আর কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত।ভীমতাল ছিল আমাদের কাছে একটা বিস্ময়, একটা অবাক আনন্দ, একটা অপার প্রাপ্তি যা আমাদের চিন্তা, ভাবনা বা কল্পনার একদম বাইরে। ও হ্যাঁ পরে জেনেছিলাম যে তাল মানে হল লেক! এখানেই একটি দিন অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায়। আছে অনেক অনেক হোটেল, মোটেলসহ নানা রকম থাকার যায়গা।