ঢাকা রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

সমুদ্রের ডাকে কক্সবাজারে

মানুষ আর সমুদ্রের মধ্যে যেন এক গভীর প্রণয়। বায়ু পরিবর্তনের জন্য কিংবা নিছক আনন্দের জন্য বন্ধু-পরিজন নিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় সমুদ্রের কথা। সমুদ্রের সঙ্গে এই যে আত্মার বন্ধন, তা চাইলেও তো ছিন্ন করা যায় না। তাই সামনের ঈদ-পূজার ছুটিতে অনেকেই হয়তো যাবেন সমুদ্রের ডাকে সাড়া দিতে। বাংলাদেশের সমুদ্র বলতেই তো কক্সবাজার। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুময় সৈকত হিসেবে পরিচিত এই কক্সবাজারে বছরের এই সময়টাতে থাকে প্রচুর পর্যটকের আনাগোনা। আজ জেনে নেওয়া যাক এই কক্সবাজার সম্পর্কে।

কীভাবে যাবেন কিংবা কোথা থেকে শুরু করবেন বলার আগে কক্সবাজারের সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক। কক্সবাজার পূর্বে ‘পানোয়া’ নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ হচ্ছে হলুদ ফুল। ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকত চট্টগ্রামের ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানের কক্সবাজার নামটি করা হয়েছে তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার হিরাম কক্সের নামে। ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনামলে ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান রিফিউজি এবং আঞ্চলিক রাখাইনদের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এই উদ্দেশ্যে একটি মার্কেট স্থাপন করা হয়, যার নাম হয় কক্সমার্কেট বা কক্সবাজার। আর কালের বিবর্তনে এই নামটিই স্থায়ী হয়ে যায়।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটের যেকোনো বাস ধরে চলে আসতে পারেন কক্সবাজার। সে ক্ষেত্রে খরচ হতে পারে ৮০০-৯০০ টাকা। ঢাকা-কক্সবাজার যাওয়া-আসা করা বাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে গ্রিনলাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন প্রভৃতি। সাধারণত সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসগুলো ছেড়ে যায়। তবে কেউ চাইলে ট্রেনেও আসতে পারেন; কিন্তু সে ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে নেমে আবার বাসে করে যেতে হবে কক্সবাজারের উদ্দেশে। সামর্থ্য থাকলে বিমানপথেও আসতে পারেন, এ ক্ষেত্রে সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিটের মতো।

কক্সবাজারে সাধারণত মানুষ লম্বা ছুটি কাটাতে যায়, সে ক্ষেত্রে হোটেল আগে থেকেই বুক করে রাখা যেতে পারে। আর যদি বুক করা না থাকে, তাহলে কক্সবাজারে নেমে সর্বপ্রথম কাজ হবে হোটেলের সন্ধান করা। পর্যটকদের জন্য পুরো এলাকাটিতে ছড়িয়ে আছে অনেক হোটেল, তাই খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দিনের পুরোটা সময়ই ভিড় থাকে। এ স্থানটি লাবণী বিচ হিসেবে পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে সবচেয়ে কাছে এই বিচ। এখানে নানা বয়সী নানা পেশার মানুষকে খুব হৈ-হুল্লোড় করে সমুদ্রে নেমে যেতে দেখা যায়। চারপাশে রয়েছে কিছু ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা। শামুক, ঝিনুকের মালা, আচার, টুকিটাকি খাবারের মেলা নিয়ে বসে এরা। সৈকতের পাশ ঘিরে আছে সারি সারি ছাউনি। ৫০-১০০ টাকায় যেগুলো অনেকেই ভাড়া নিয়ে থাকেন বিশ্রামের জন্য। চাইলে কেউ ঘোড়ায়ও চড়তে পারেন এখানে। কিছু লোক ঘোড়ার লাগাম হাতে, কেউ বা ক্যামেরা হাতে ছবি তোলার সুযোগ পেতে সদাই ব্যগ্র। সব মিলিয়ে আশপাশের পরিবেশটি যেন মুখর হয়ে ওঠে। দিন শেষে বিকেলের দিকে সমুদ্র যেন অনেকটাই শান্ত হয়ে যায় যেন। সারা দিনের লম্ফজম্ফ শেষে মানুষগুলো আসে সূর্যাস্ত দেখতে। সূর্যাস্ত কক্সবাজারের অন্যতম আকর্ষণের দিকের একটি। সমুদ্রের বুকে লাল সূর্যের লুটোপুটি খাওয়া যেন দারুণ চিত্তাকর্ষক।

কক্সবাজারে রয়েছে আরো কিছু ভ্রমণযোগ্য স্থান। জেনে নেওয়া যাক সেগুলো সম্পর্কে। কক্সবাজার শহরের দক্ষিণে রয়েছে হিমছড়ি ন্যাশনাল পার্ক। ছোট ছোট পাহাড়, ঝর্ণা আর চারদিকে সবুজ নিয়ে মাথা তুলে আছে হিমছড়ি। সময় করে ঘুরে আসতে পারেন এখানে। চলে যেতে পারেন আগামদা খায়াঙ্গে। কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় এই বৌদ্ধবিহার এখানকার বৌদ্ধদের জন্য খুবই সম্মানের জায়গা। এর স্থাপনাও যথেষ্ট নজরকাড়া। হাজার বছরের পুরোনো এই মন্দিরে আছে ছোট ছোট প্রার্থনাকক্ষ আর নানা আকৃতির ব্রোঞ্জের তৈরি গৌতম বুদ্ধের ছবি। আরো মন্দির দেখতে চাইলে রামু যাওয়া ভালো। কক্সবাজার থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। রামু নানা রকম হস্তশিল্প এবং হাতে তৈরি সিগারের জন্য বিখ্যাত। এসব স্থানে যাওয়ার জন্য রয়েছে বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি, যাকে স্থানীয়রা টমটম বলে থাকে।

স্থলে ঘোরাঘুরি করে আবার চলে যেতে পারেন জলের দিকে। বলছিলাম ইনানী বিচের কথা। কক্সবাজার থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইনানী বিচে চলে আসতে পারেন টমটম করে। লাবণী বিচের মতো খুব বেশি মানুষের ভিড় হয় না এখানে, যা অনেকটাই প্রশান্তিদায়ক। এখানকার সোনারঙ্গের বালুকা আর স্বচ্ছ জলের রাশি সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব দৃশ্যের। মহেশখালী থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। ফিশারিবাজার থেকে স্পিডবোটে ৪০ মিনিটের পথ। ২৬৮ বর্গকিলোমিটারের এই ছোট্ট দ্বীপ উপকূল রেখা বরাবর অবস্থিত। অসম্ভব সুন্দর এই দ্বীপটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রকম ছোট ছোট পাহাড়, যেগুলোর উচ্চতা ৩০০ ফুটের বেশি নয়। এই দ্বীপের সৌন্দর্য যেন নাটকীয়তা আর নৈসর্গিয়তায় ভরপুর। হাতে সময় থাকলে আরো ঘুরে আসতে পারেন সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া দ্বীপ। টেকনাফ থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

নীল আকাশ আর নীল জলরাশি—এ দুইয়ের সমন্বয়ে যেন কক্সবাজার। গভীর রাতে সমুদ্রের মাঝে জোছনা যেন বাড়তি পাওনা। প্রকৃতির এত কাছে এসে বহুদিন ফাইলের নিচে চাপা পড়া কবিমনও যেন জেগে উঠবে। সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের গুঞ্জন যেন এতদিনের ক্লান্তিকে কাটিয়ে দিতে পারে এক মুহূর্তে। আর এসব কিছুই উপভোগ করতে হলে চলে আসতে হবে কক্সবাজারে। সমুদ্র যেন আপনারই অপেক্ষায়।

কোথায় থাকবেন

কক্সবাজারে আছে পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে ছোট হোটেলও। সব ধরনের মানুষের কথা মাথায় রেখেই নানা রকম হোটেলে ভরপুর এই পর্যটন নগরী। পাঁচতারা হোটেলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিটল বে রিসোর্ট, মারমেইড ইকো রিসোর্ট, হোটেল ওয়াসিস ইত্যাদি। কম খরচের মধ্যে যেসব মোটেল রয়েছে—হোটেল কল্লোল, কক্সবাজার ইন, সারমম গেস্টহাউসসহ আরো অনেক। এসব হোটেলে খরচ পড়তে পারে দুই থেকে তিন হাজার টাকার মতো।

কোথায় খাবেন

খাবারের খরচ নির্ভর করছে আপনার চাওয়ার ওপর। বিলাসী রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে কম খরচে খাওয়ারও চমৎকার ব্যবস্থা আছে এখানে। তবে স্বাদ আর খরচের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিছু রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয় এখানে। এর মধ্যে রয়েছে ঝাউবন রেস্টুরেন্ট, নিরবিলি রেস্টুরেন্ট, পাউশী রেস্টুরেন্ট, পানকৌরী রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও পথে পথে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান তো আছেই।