ঢাকা সোমবার, জুন ৮, ২০২৬

সবুজের লীলাভূমি সিলেট ঘোরার গল্প

পড়াশোনার চাপে হাঁসফাঁস লাগছিল। টানা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি। ভাবছিলাম কোথাও থেকে যদি ছোটখাটো একটা ট্যুর দিয়ে আসা যেত, তাহলে ভালোই হতো। ঢাকা থেকে দুদিনের  ট্যুরে সিলেট ভ্রমণ। শুক্রবার যেহেতু ছুটির দিন, সঙ্গে শনিবার ছুটি নিলেই দিব্যি চলে যাওয়া যাবে। কাছের কয়েকজন বন্ধুকেও বললাম। তারাও যেতে রাজি হয়ে গেল। সাথে পরিচিত আরো অনেকেই যেতে রাজি হল।

ঢাকার কমলাপুর থেকে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার ট্রেনে আমরা ১৪ জনের একটি দল যাত্রা শুরু করি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গল্প-আড্ডায় মেতে উঠি। ট্রেন ভ্রমণ অনেক আনন্দের। রাত বাড়তে থাকে। একে একে সবাই ঘুমের প্রস্তুতি নেই।

পরদিন ভোর ৫.৩০ মিনিটের দিকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সকালের সুন্দর পরিবেশ দেখে মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমরা অপেক্ষায় রয়েছি কখন সিলেট পৌঁছাব। ৬টার দিকে ট্রেন সিলেট এসে থামল। সবাই যার যার মতো ছবি তুলতে শুরু করল। এর পর মাইক্রোবাসে করে আমাদের গন্তব্য হোটেল পৌঁছলাম। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। হোটেল থেকে বের হয়ে দেখি আমাদের লেগুনাও চলে এসেছে। দলের সবাই দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে দুটি লেগুনায় উঠে পড়লাম। উদ্দেশ্য নাশতা করতে যাওয়া। একটি হোটেলে নাশতা সেরে ফের উঠে পড়লাম লেগুনায়। আমরা যাচ্ছি বিছানাকান্দির উদ্দেশে। সিলেট শহর থেকে ২ ঘণ্টার পথ আইরকান্দি নৌকা ঘাট। সেখান থেকে নৌকায় করে বিছানাকান্দি যেতে হয়। অনেক লম্বা পথ, তাই সবাই মিলে ঠিক করলাম গানের কলি খেলেই সময় পার করে দেব। শুরু হয়ে গেল খেলা। মেয়েরা এক দলে আর অন্য দলে ছেলেরা। রাস্তার অবস্থা যদিও তেমন ভালো ছিলো না, তবুও সবার সঙ্গে আনন্দ করে যাওয়াটাই ছিল মুখ্য।

প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা আইরকান্দি নৌকা ঘাটে এলাম। সেখান থেকে নৌকায় চেপে বিছানাকান্দি গেলাম। মেঘে ঢাকা আকাশ, পাহাড় থেকে প্রবাহিত সুশীতল ঝরনাধারা সব মিলিয়ে অবিশ্বাস্য সুন্দর এক জায়গা। পাথরজলের বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম।সবাই পানিতে নেমে দাপাদাপি আর আনন্দে মেতে উঠল। প্রায় ২ ঘণ্টা পর পানি থেকে উঠে আমরা দুপুরের খাবার খেতে বসলাম পাশের একটি হোটেলে। ভাত, শুঁটকি ভর্তা, গরুর মাংস আর ডাল দিয়ে পেটপুরে খাওয়াদাওয়া করলাম। এত মজার শুঁটকি ভর্তা আগে কখনো খাওয়া হয়নি। হাতে কিছু সময় থাকায় ফেরার পথে আমরা চা বাগান দেখে আসি। শুধু তাই নয় হোটেলে ফেরার পথেই সাতরঙা চা খেয়ে নিলাম।

হোটেলে ফিরে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আমরা যাই সিলেটের বিখ্যাত ‘পাঁচভাইহোটেলে’ রাতের খাবারের জন্য।তাড়াতাড়ি করে ভাত, মাছ, ভর্তা দিয়ে পেটপুরে খেয়ে নিলাম। এরপর মাজার জিয়ারত করে হোটেলে ফিরি। আমি জোর করে সবাইকে ঘুমাতে পাঠাই। কারণ সকালে যেতে হবে আরো তিনটি জায়গায়।

শনিবার সকাল ৬টায় ঘুম ভাঙে। এর পর ফ্রেশ হয়ে সবাইকে নিয়ে ‘ডিঙ্গি’হোটেলে নাশতা সেরে নেই।এবার আমরা যাচ্ছি রাতার গুলের উদ্দেশে।রাস্তা প্রায় ২ঘণ্টার।শেষ দিনটা সবাই অনেক আনন্দ করেছি।অবশেষে ২ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে রাতারগুল পৌঁছাই। এক নৌকায় ছয়জন করে যাত্রা শুরু করি।

বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল। এত দিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও এখন রোজই পর্যটকদের পদভারে মুখরিত থাকে এ স্থান। এখানে ঘোরার সেরা সময় বর্ষাকাল। মাথার ওপর সবুজের সমারোহ আর নিচে স্বচ্ছ, শান্ত জলরাশি আপনাকে নিয়ে যাবে কল্পনার জগতে। ওপরে তাকালে দেখা মিলতে পারে হিজল-কড়চের ডালে কালো বানর, কাঠবিড়ালি কিংবা পানকৌড়ি। গাছের ডালে ডালে পাখপাখালির কলতান আপনাকে নিয়ে যাবে এক অন্য ভুবনে। আবার নিচে তাকালে দেখতে পারেন জলের মাঝে সরালি ও বালিহাঁসের ডুবো খেলায় মেতে ওঠার দৃশ্য।

সিলেট ভ্রমণে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল জাফলং। সিলেট শহর থেকে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের পথ জাফলং। সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় পিয়াইন নদী অববাহিকায় জাফলং অবস্থিত। জাফলং পৌঁছে ভাত আর মাংস দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিই। এর পর রওনা হই সেনগ্রামপুঞ্জির উদ্দেশে। আশপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটা সময় গিয়ে পৌঁছলাম পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছোট ছোট ঝিরি পথে পাহাড়ি ঝরনার পানি নেমে আসছিল। সকালের স্নিগ্ধতার সঙ্গে জলের শব্দ একটা অন্য রকম আবেশ তৈরি করছিল। আশপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে প্রায়ই আমাদের পথচলা থমকে যাচ্ছিল। ঝরনায় মায়াবি রূপে আমরা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল আর আমি ব্যস্ত ছিলাম ভিডিও ধারণে। আমরা জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে চলে আসি। জাফলংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য আমাদেরকে মোহিত করে। স্বচ্ছ পানিতে নেমে সবাই আনন্দ করতে থাকি। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, এবার ফেরার পালা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু সিলেটের সৌন্দর্য বুকে নিয়ে সেদিনই আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।