মসজিদ এমনিতেই একটি অন্যতম প্রশান্তির যায়গা। আর শুধু মসজিদ কেন, আমার তো মনে হয় যে কোন ধরনের উপাসনালয়ই ধর্ম ও মানুষের বিশ্বাসভেদে মানুষের অন্যতম প্রশান্তির একটি যায়গা। আর সেই মসজিদ যদি কোন পাহাড় প্রেমী মানুষের কাছে তার সবসময়ের অন্যতম প্রশান্তির যায়গায় অবস্থিত হয়ে থাকে তাহলে তো আর কথাই থাকেনা। ঠিক এমনই একটি মসজিদের খবর আমার জানা ছিল সুখের স্বর্গ রুপী কাশ্মীরের শ্রীনগরে।
যে মসজিদের চারপাশ জুড়েই আছে নানা রকম পাহাড় আর পাহাড়ি প্রশান্তির বাতাস আর টলটলে জলের পরশ। আর পাহাড়ি প্রশান্তির পরশের সাথে যদি থাকে চির প্রশান্তি প্রদান করে যাওয়া কোন এক মসজিদের আহবান, লেকের জলের ঢেউ খেলে যাওয়া আনন্দ, তবে তেমন একটি মসজিদের দর্শন করা, তেমন একটি মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ার ইচ্ছা, তেমন একটি মসজিদের সবুজের ছেয়ে থাকা গালিচায় কিছু সময় নীরবে বসে কাটানোর ইচ্ছা জাগবে যে কোন প্রশান্তি প্রিয় মানুষের।
আমি নিজে সবসময় শান্তি প্রিয়। সবসময় আর সব যায়গায় প্রশান্তিটাই আমার কাছে মুখ্য তাই ঠিক করে রেখেছিলাম কাশ্মীর যদি কোনদিন যাওয়া হয় তবে শ্রীনগরের হযরতবাল মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবো। একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল এটা, শুধুই নিজের কাছে। তাই যেদিন থেকে কাশ্মীর যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু হল তখন থেকে শ্রীনগরের হযরতবাল মসজিদের নামাজ পড়বো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু তখনো জানিনা যে আমরা যখন কাশ্মীরের শ্রীনগরে যাবো বা থাকবো তখন থাকবে রমজানের শেষ সময় আর ঈদ কাছাকাছি সময়ে।
তখন থেকে তো হযরতবাল মসজিদে নামাজ আর বিশেষ করে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে গেছে। এমন দুর্লভ একটা যায়গার, তার চেয়েও দুর্লভ একটি মসজিদে, এমন দুর্লভ এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারা তো ভীষণ সৌভাগ্যবানরা একমাত্র পেয়ে থাকে। তবে কি আমিও এমন সৌভাগ্যের অধিকারী বা এতোটা সৌভাগ্যবানদের মধ্যে পড়েছি? এই কথা ভাবতেই কি যে একটা রোমাঞ্চ নিজেকে ছুঁয়ে গেছে বলে বোঝানোর মত নয় আদৌ।
আর শুধু এই কারনে, পোশাকের আভিজাত্য বিমুখ আমি, শুধুমাত্র হযরতবাল মসজিদের মত এই বিশেষ মসজিদে, বিশেষ যায়গা, বিশেষ নামাজ পড়ার জন্য একটা বিশেষ পোশাক পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছিলাম। অনেক দিন থেকে কিনে রাখা, দারুন প্রিয় হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবী। শুধুমাত্র কোন এক ঈদে এই রকম দুর্লভ যায়গার, দুর্লভ মসজিদে নামাজ পড়ব বলে আমি একটা পাঞ্জাবী আলাদা করে রেখেছি দেখে অনেকেই বেশ অবাকই হয়েছে। এমনকি আমি নিজে পর্যন্ত নিজের এই কাজে নিজের কাছেই অবাক হয়েছি। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা এই মসজিদ আর সেখানে নাজাম পড়ার আনন্দ ভাবনায়।
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যার শ্রীনগরের ডাল লেকের পাড়ে আমাদের হোটেল ডাল ভিউয়ের বেলকোনিতে বসে আছি। আর ভাবছি আগামী দিনের কথা। কাল ঈদ, হযরতবাল মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য ঈদের কাপড় প্রস্তুত করছি। আর সেই সাথে আগামীকাল হযরতবাল মসজিদে নামাজ পড়তে যাবো বলে ছেলের মাকে জানালাম। কিন্তু ছেলের মা, বেশ ধার্মিক আর সবসময় নামাজের ব্যাপারে দারুন কড়াকড়ি হওয়া সত্ত্বেও এই প্রথম আমার হযরতবাল মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে যেতে দিতে কিছুতেই রাজি হলনা। কারন একটাই নানা রকম ঈদ বা এমন আনুষ্ঠানিক সময়ে অনেক লোকের সমাগমস্থলে কাশ্মীরের সহিংসতার ব্যাপারে দারুন সন্দিহান আর ভীতু।
তার এই ভাবনা, চিন্তা আর শঙ্কা মোটেই অমুলক ছিলোনা তাই সবকিছু সাধ্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও আমার হযরতবাল মসজিদের মত দুর্লভ মসজিদে ঈদের মত দুর্লভ নামাজ আর পড়ার সৌভাগ্য হলনা সেবার। এমনকি ওইদিকে যাওয়া পর্যন্ত হলনা। এই প্রথম আমার কোন ছোট্ট স্বপ্ন হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও সেটাকে পুরন করতে পারিনি। যদিও এই নিয়ে খুব বেশী আক্ষেপে আমি পুড়িনি। খুব বেশী কষ্ট পাইনি কারন আমি বিশ্বাস করি উপরওয়ালা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তাই মেনে নিয়েছিলাম সেই সান্ত্বনা থেকে।
কিন্তু ঈদের নামাজ নাহয় আদায় করতে পারিনি, তাই বলে কি মসজিদ দর্শন করতে পারবোনা? এমন দুর্লভ মসজিদের পাহাড়ি ভ্যালীর সবুজ গালিচায় কি বসে, হেটে, দেখে, উপভোগ করতে পারবোনা? সে হতেই পারেনা। কিছুতেই না। তাই ঠিক করে রেখেছিলাম পেহেলগাম থেকে ফিরে পুরো একটি দিন তো শ্রীনগরে থাকবোই, তখন পুরো একবেলা কাটাবো এখানে। উপভোগ করবো হযরতবাল মসজিদের ইতিহাস, অপূর্বতা, আভিজাত্য আর আত্মিক প্রশান্তি।
ঠিক তাই-ই করেছিলাম। যেদিন পেহেলগাম থেকে ফিরেছিলাম। কোন রকমে বিকেল আর রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালেই একটা অটোতে করে চলে গিয়েছিলাম হযরতবাল মসজিদের পাহাড় আর ডাল লেকে ঘেরা টলটলে আর সবুজ প্রাঙ্গনের প্রশান্তির প্রান্তরে।
মসজিদের গেটের বাইরে লোকাল বাজারের চিরন্তন ব্যস্ততার চিত্র। কিন্তু গেটের ভিতরে ঢোকার মুখেই ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতরের উচ্ছ্বসিত অভ্যারথনা মুহূর্তেই আনন্দে ভাসিয়ে তুলেছিল। শত শত নয়, বোধয় হাজারের মত কবুতরের ঝাঁক স্বাগত জানায় যে কোন আগত অতিথিকে। দারুন উচ্ছ্বাস আর আনন্দে মেতে ওঠে ওরা যে কোন নতুন অতিথি এলেই। ওদের উচ্ছ্বাসের সাথে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিলাম আমরাও। হাজারো কবুতরের অভ্যারথনা পেরিয়ে লোহার রেলিং পার হয়েই বিস্তীর্ণ সবুজের গালিচা। যেন নরম, কোমল সবুজ মখমলের আহবান।
সবুজ গালিচা, উচ্ছ্বসিত কবুতরের ঝাঁক, একপাশে ডাল লেকের টলটলে জলের হাসির মাঝেই দাড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা, আভিজাত্যে আর অপার্থিব আকর্ষণে ভরপুর হযরতবাল মসজিদ। যার পশ্চিমে চোখ ফেরালেই দেখা মেলে আকাশ ছোঁয়া সবুজ পাহাড় আর দুরের শ্বেতশুভ্র পর্বত মালার। আর এই মসজিদের বিশেষ বিশেষত্ব, যে কোন মুসলমানের জন্য অন্যতম আকর্ষণ আর শিহরণ। এখানে, এই মসজিদে সংরক্ষিত আছে পৃথিবীর সেরা মানব, আল্লাহর দোস্ত আমাদের মহানবী হযরত মোহাম্মমদ (সাঃ) এর এক গুচ্ছ দাঁড়ি মোবারক!
নাহ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। সব সময় দেখা যায়না। বিশেষ বিশেষ দিন বা ক্ষণ ছাড়া। তবে রোমাঞ্চিত হয়েছি জেনে। শিহরিত হয়েছে প্রতিটি রোমকূপ, এমন একটা যায়গায় যেতে পেরেছি, পরশ পেয়েছি এমন দুর্লভ মসজিদের। হেঁটেছি, বসেছি আর কিছু অমুল্য সৃতি ধারন করতে পেরেছি দুর্লভ এই যায়গার দুর্লভ মসজিদের অপার্থিব চারপাশের তাতেই আমি খুসি, তাতেই আমি আনন্দিত আর তাতেই ছিল আমার অন্যরকম একটা প্রাপ্তি।