বেশ কদিন থেকেই মনের মধ্যে একটা উথাল-পাথাল অবস্থা। কেমন যেন একটু পাগল-পাগল লাগছিল ভেতরে ভেতরে। কিন্তু প্রকাশ করার কোন উপায় ছিলোনা। সেই সাহস বা দুঃসাহস কোনটাই ছিলোনা। কতদিন তাকে দেখিনা, পাশে বসিনা, কাছে যাইনা আর ছুঁয়ে দেখার তো প্রশ্নই আসেনা। কিন্তু অবাধ্য আবেগ তাকে একবার দেখার জন্য, পাশে বসার জন্য, একটু স্পর্শ করার জন্য ছটফট করতে লাগলো।
তাই একটু সুযোগ পেয়েই ছুটলাম তার কাছে। মনে মনে ভাবলাম, যাই এবার কাছে গিয়ে একটুখানি দেখে তাকে ভুলিয়ে দেব বা ভুলে থাকার চেষ্টা করবো কমবেশী। এতটা হয়তোবা আসলেই বেশী বেশী হয়ে যাচ্ছে। সবাই যেহেতু বলছে।
যাই এবার ঘুরে আসি, আর না হয় যাবনা সহসা। মনের ভেতরের বয়ে চলা আর ঝড় তোলা উথাল পাথাল ঢেউয়ের পাগলামিটা কমিয়ে আসি। গেলাম, তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান দেখলাম। হাসেনি সে, কোথা বলেনি আগের মত করে, সাজেনি অন্য বারের মত, গুমোট হয়েছিল পুরো সময়টুকু। কিন্তু তার নতুন অরণ্যের আকর্ষণ, মাধুর্য, মায়া আর আহবান আমাকে বিমোহিত করেছে।
তার জলাশয় দেখে অভিভূত হয়ে গেছি। গভীর অরণ্যের মাঝে, গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদের ঝিলিক দেখে পাগল হয়ে গেছি, কচি সবুজ চা গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকে শিশির বিন্দু দেখে অপলক তাকিয়ে থেকেছি, দারুণ শীতে কুসায়ার চাদরে ঢাকা প্রান্তরে একা একা ডুব দিয়েছি, সকালের প্রথম আলোর, নরম উত্তাপ মেখে কোথায় হারিয়েছি নিজেই বুঝতে পারিনি।
এরপর ছুটন্ত ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে কান পেতে থেকেছি, বাতাসের হুহু শব্দ শুনতে, খোলা জানালায় বসে শীতের আলতো রোদের পরশ মাখাতে, আরামে-আবেশে আকুল হতে, দুচোখ বুজে অপার্থিব সুখ অনুভব করতে। কিন্তু যখনই চোখ মেলে তাকিয়েছি, পার্থিব পৃথিবীর ঘন অরণ্যের মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছি শত রঙের পেখম মেলে নেচে যাওয়া ময়ূরের উচ্ছ্বাসের দিকে, উন্মাদ হয়ে তাকিয়ে থেকেছি অরণ্যের মাঝ থেকে আমার প্রেয়সীর, পাহাড়ের চুড়ার আহবান পেয়ে, পাগলের মত ছোটাছুটি করেছি পাহাড়ি অরণ্যের মাঝে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের টলমলে ধারা দেখে, দূরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে শীতের শুকিয়ে যাওয়া ঝর্ণার ক্ষীণ হয়ে ঝরে পরা কষ্ট দেখে।
এসব দেখে দেখে, আর না চাইতেই এসব পেয়ে, আমি নিজেকে আবারো হারিয়ে ফেলেছি। হায় কি হবার আর কি হল? কি চেয়েছিলাম আর কি পেলাম?
কি ভেবেছিলাম আর ঘটলো? আমি তো এবার তাকে ভুলতে গিয়েছিলাম।
ভেবেছিলাম এবার গিয়ে একটু তার প্রতি আকর্ষণ কিছুটা কমিয়ে ফেলবো, তাকে দেখার সাধ মিটবে, আগেরমত অতটা আকুল আর ব্যাকুল নিশ্চয়ই হবোনা এবার।
কিন্তু একই সর্বনাশ হল আমার! আমি যে উল্টো আরও বেশী করে তার ভাবনায় ডুবে গেছি, তার গভীর অরণ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি, তার টলটলে জলাশয়ে ডুব দিয়েছি, তার কুয়াসার চাদরে নিজেকে ঢেকে ফেলেছি, তার উষ্ণতার আদর মেখেছি, তার ধসুর আলিঙ্গনে আরও বেশী জড়িয়ে গেছি!
যেখানে তার কাছে আর যাবোইনা বলে ধরে নিয়েছিলা, তাকে আর না দেখলেও চলবে বলে ভেবেছিলাম সেখানে উল্টো এখন সে আমাকে আরও বেশী করে টানছে, নতুন করে বেঁধেছে, কোথায় যেন আমাকে আটকে ফেলেছে, আমি নিজেই ঠিক জানিনা। এখন যে তাকে আরও বেশী করে কাছে চাই, অনেক বেশী করে দেখতে ইচ্ছে হয়, ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকতে মন চায়, বারে-বারে তারজন্য বাঁধন ছিঁড়তে ইচ্ছে হয়!
এবার সে যে সবুজ শাড়ি পরেনি, নিলে সাজেনি, কমলা-গোলাপি রঙে নিজেকে রাঙায়নি, চোখে কাজল আঁকেনি, গালে ব্লাসনের ছোঁয়া দেয়নি, বাঁকা ঠোঁটে হাসেনি, ঝর্ণার গান শোনায়নি, সুখের অশ্রু ঝরায়নি, গভীর আলিঙ্গনে বাঁধেনি, মান-অভিমানের পসরা নিয়ে বসেনি, তবুও…
এটা আমার কিভাবে হল আর কেন হল?
সে আমার আর কেউ নয়……
প্রেয়সী দার্জিলিং……
যাকে,
ভুলতে গিয়ে, বাঁধনে জড়ালাম!!