ঢাকা বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা ও বিকাশের অন্তরায়সমুহ (প্রথম পর্ব)-মোস্তাক আহমেদ

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারি তরফ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত করা বাদেও অধুনা ২০১০ সালে পর্যটন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য বাংলাদেশে পর্যটক আকর্ষণের যেসমস্ত ক্ষেত্র রয়েছে সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা এবং নতুন নতুন খাতের সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় যেসব ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন রয়েছে সেগুলোকে দালিলিক প্রমাণ স্বরূপ বই আকারে তুলে ধরার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন এর ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলাওয়ারী ব্র্যান্ড বুক প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রতিটি জেলার নিজস্ব প্রধান আইটেমকে সামনে রেখে এর একটি ব্র্যান্ডিং নামকরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে ঐ জেলা দেশেবিদেশে তার ব্র্যান্ডিং নামেই পরিচিতি হবে। যেমন- কুষ্টিয়া জেলাকে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক জনপদ কুষ্টিয়া’ Kushtia, the cultural hub নামে, নাটোরকে ‘রাজসিক নাটোর’ কিংবা রাজশাহীকে ‘সিল্কসিটি’ হিসেবে। অর্থাৎ এ নামেই প্রতিটি জেলা এখন থেকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হবে। ব্র্যান্ড বইটি বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে করা। অর্থাৎ বিদেশী পর্যটকেরা যাতে এ বই পড়ে তথ্য উপাত্ত জানতে পারে ও বুঝতে পারে। আমি কুষ্টিয়া জেলা ব্র্যান্ড বুকটি সম্পাদনা করেছি। এর ফলে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হৃদয়াঙ্গম করা আমার জন্য সহজ হয়েছে।
বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। এদেশের মাটি যেমন উর্বর তেমনি এর জনগোষ্ঠীও মেধা ও মননে অনন্য। বিপুল সম্পদ ও সম্ভাবনার কারণে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বহিঃ জনগোষ্ঠীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ বাংলা। তাইতো নানা সময়ে বাংলার রূপ ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মোগল, পাঠান, সেন, পর্তুগীজ, ইংরেজসহ বিদেশী বেনিয়ারা এদেশে এসেছে। কেউ এসেছিল ব্যবসা করতে। কেউ এসেছে এর রূপ লাবণ্য দেখতে পর্যটক বেশে। কেউ কেউ এর রূপ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে শেষমেশ এ ভূমেই থেকে গেছে। তাইতো বাঙ্গালীকে বলা হয় শঙ্করজাতি।
বহুজাতিক আগমনের কারণে বাংলাদেশের আনাচেকানাচে নানা প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। বৌদ্ধরা সবচে বেশী নিদর্শন রেখে গেছেন। তার অন্যতম কারণ তারা বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালবেসেছিলেন এবং এর লালনপালন ও বিকাশে কাজ করেছিলেন। কুমিল্লার ময়নামতি, বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের অলংকার হিসেবে এখনো সদর্পে শোভাবর্ধন করে চলেছে। মুসলিম স্থাপনার মধ্যে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এছাড়া সিলেটে হযরত শাহজালাল ও শাহপরান (রঃ) এর মাজার, রাজশাহীর শাহ মকদুম (রঃ) এর মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী (রঃ) এর মাজার পর্যটকের অন্যতম আকর্ষণ। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ আনব্রোকেন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের একচ্ছত্র মালিকানাধীন বিশ্ব ঐতিহ্য যা দেশী বিদেশী পর্যটকদের বিনোদনের তীর্থভূমি। বিশ্বের একমাত্র বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন বাংলাদেশের অহংকারের বস্তু। সুন্দরবনও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। হিন্দু আমলের অনেক উপাসনালয় ও স্থাপনা এখনো পর্যটকদের দারুণভাবে নাড়া দেয়। পার্বত্যচট্টগ্রাম প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সুবিস্তৃত অরণ্য, থরে থরে সাজানো পাহাড়রাজি দেখে যে কেউ আনমনে ভাবে এরই পথ ধরে ঐ দূুর আকাশে উঠে যাবে কিয়ৎক্ষণ পরেই। পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা ঝর্ণা, তার থেকে উদগত নদীনালার সুমিষ্ট পানি প্রাণ জুড়িয়ে ক্লান্তিকে বিদায় দেয় আগন্তুকদের। পাহাড়ের সাথে সখ্যতা গড়তে ঠিক তারই পাদদেশে সমান্তরালে আপন মহিমায় সৌন্দর্যের আকর ছড়িয়ে উদাস হয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে চলেছে রাঙ্গামাটির কাপতাই লেক। যেন পাহাড়ের গা’কে শীতল রাখতেই এ প্রস্রবণ তৈরি করা। পাহাড় সমতলের কী এক সমন্বয় স্বয়ং স্রস্টা এখানে করে দিলেন। অন্যরকম বৈচিত্র্য চোখে পড়ে কক্সবাজার থেকে ইনানী হয়ে টেকনাফ যেতে। একপাশে বিস্তৃত অপার সমুদ্র ঠিক আরেকপাশে মাথা উচু করে ঠাই দাড়িয়ে আছে ভূমি স্তম্ভ পাহাড়ের সারি। পাহাড় সমুদ্রের এমন সমভিব্যাহার পৃথিবীতে খুব কমই চোখে পড়ে। একদিকে অসীম নীল অতল সমুদ্রের দুর্দান্ত লাফালাফি, অন্যদিকে নিরব নিস্তব্ধ নিথর পাহাড়ের দাড়িয়ে থাকার মাঝে কী মারেফাত বিদগ্ধ পর্যটকগণ নিজস্ব ব্যাখ্যা খুঁজবেন নিশ্চয়। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সমুদ্রকন্যা সেন্টমার্টিনকে দেখা যাবে ভাসমান সমুদ্রের মাঝে। জল আর স্থলের এ মেলবন্ধন সত্যিই অবাক করার মতন। সিলেটের চাবাগান আর ছোটছোট টিলা ও পাহাড়ের রূপ ও সৌন্দর্যে মোহিত না হয়ে উপায় নেই। জাফলং এ গেলে যেন ওপাড়ের পাহাড় হাতছানি দিয়ে বলে- এসো, এসো, এসো তুমি আমার ধারে এসো। সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ অনন্য সৌন্দর্যময় হাওড় বাওড়; নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের কোলজুড়ে বিস্তৃত চলনবিল; পদ্মা- মেঘনা- সুরমা- কর্ণফুলী- রূপসা- কংস- মধুমতী- কপোতাক্ষ-আড়িয়ালখাঁসহ নদীমাতৃক বাংলার কলকল ধ্বনি পর্যটকদের হৃদয়ানুভূতিতে নাড়া দিবে নিশ্চয়। রাজশাহী ও রংপুরের বিস্তীর্ণ প্রকৃতির আলাদা এক ঢং- বরেন্দ্রভূমির বৈচিত্র্যময় উঁচুনিচু পথচলা জীবনের বন্ধুরতারই ইঙ্গিত দেয়। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের গারো পাহাড় কার না আকর্ষণ করে? নেত্রকোনার দুর্গাপুরের পাহাড়, চির যৌবনা সমেস্বরী নদ, সাদামাটির পাহাড়, উপজাতিদের জীবনবৈচিত্র ও প্রকৃতির অপরূপ রূপলীলা আপনাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও গারো ললনাদের প্রেমে ফেলবেই। এখানের বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত ঘেষে দুই পাহাড়ের অচলায়তন স্থির চেয়ে থাকা দেখে অবোধ শিশুটিও বুঝতে পারে – ওরা পরস্পর সহোদর। মহাকালের কঠিন নিয়মে বিচ্ছেদ হয়ে নাকের ডগার দুইপ্রান্তে পরে থাকা সহোদরাদ্বয় বিচ্ছেদ ব্যথায় অহর্নিশ অশ্রু নিঃসরণ করে সমেস্বরী নদে রূপান্তরিত করে দিলেও ভাগ্যনিয়ন্তাদের তাতে দৃষ্টি কাড়েনা। রাজা জমিদারদের ব্যবহৃত গৃহস্থালি সামগ্রী, ঘরবাড়ি, বড়বড় পুকুরঘাট এখনো পর্যটকদের আকর্ষণের বস্তু। রাজশাহীর পুটিয়া ও নাটোরের রাজবাড়ি দেখতে এখনো প্রতিদিন দেশী বিদেশী পর্যটকদের আগমনে সরগরম থাকে পুরো এলাকা। রাজরাজড়ার গৌরবময় কাহিনী আর বীরত্বগাঁথা দেখে কারও কারও মনে রাজরানী হওয়ার স্বপ্ন জাগে। নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কুটিবাড়ী, কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুটিবাড়ীতে প্রতিদিন লেগে থাকে পর্যটকদের জটলা। প্রায় শতবর্ষ আগে গত হওয়া কবির উপস্থিতি এখনো সবাই অনুভব করে তার কবিতা গল্পে গানে, তার রেখে যাওয়া স্মৃতিফলক দেখে। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার লালন আকড়া দেশীবিদেশী বাউল ভক্তদের তীর্থভূমি। এছাড়া আরও কত নিদর্শন দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। গ্রামবাংলার রূপের অপরূপ বাহার, মেঠো পথ ধরে দূরন্ত ছুটে চলা, প্রকৃতির বিচিত্র খেলা শীত- গ্রীষ্ম- বর্ষা- হেমন্তের এমন সমাহার পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা জানিনা। বাউল- জারি- সারি- ভাটিয়ালি- মারফতি- আধুনিক গানের বৈচিত্র্যময় সহাবস্থান পৃথিবীতে এখানেই পাওয়া যায়। এদেশে তাই জন্ম নেয় একদিকে লালন- হাসন রাজা- আব্দুল আলীম- নজরুল- রবীন্দ্রনাথসহ শতসহস্র বিচিত্র মহামানবের। অন্যদিকে এখানে এসে বসত গড়ে হযরত শাহজালাল- শাহ পরাণ- শাহ সুলতান- খান জাহান আলী- শাহ মকদুম- গুরু নানক-ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রসহ অসংখ্য বিশ্বখ্যাত ধর্মযাজকের। ধর্মীয় সহাবস্থানের এমন নজির পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এখানে পূজাপার্বণে, ঈদে, বড়দিনে, বৌদ্ধপূর্ণিমায় সবাই একত্রে ছুটি ভোগ করে আনন্দ উদযাপন করে। এদেশের মত প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ধর্মবর্ণের চমৎকার মেলবন্ধন পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এককথায় বাংলাদেশের রূপবৈচিত্র, জীবনধারা, এর প্রকাশিত অপ্রকাশিত সম্পদ ও নিদর্শন বলে শেষ করার নয়।(চলবে)