ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২

পর্যটন সম্ভাবনার এই বছরে পর্যটন শিল্প ধাক্কা খেলো সারা পৃথিবীব্যাপী

২০২০ সাল হবে সারা পৃথিবী ব্যাপী পর্যটনের এক সম্ভাবনাময় ও দ্বার উন্মোচনের বছর। সমগ্র পৃথিবী যখন করোনার ভয়াল থাবায় অন্যান্য সেক্টরে মত ধাক্কা খেয়ে বেসামাল হয়ে আছে ঠিক তেমনি সবচেয়ে বড় বেশি ধাক্কা লেগেছে পর্যটন বিষয়ক সমস্ত সেক্টরে। হোটেল মোটেল রেস্তোরা বিমান নৌ ও ট্রাভেল এজেন্সি, বুকিং ইঞ্জিন থেকে শুরু করে সমস্ত পর্যটন বিষয়ক ক্ষেত্রে বিশাল ধাক্কা লেগেছে। সে ধাক্কা সামাল দিতে কত দিন লেগে যাবে তা বলা মুশকিল।২০১৯ এর সমীক্ষা অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে ধরা হয়েছিল প্রায় ১৯ কোটি মানুষ পৃথিবীতে ভ্রমণ করে বেড়ায়। এবং ২০২০সালে ধরা হয়েছিল এই সংখ্যা ১৬০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে পর্যটক এর সংখ্যা। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে এশিয়ার টুরিস্টের সংখ্যাই ছিল ৭৫%। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার সূত্র মতে ২০১৮ সালে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ কর্মরত আছে এই পর্যটন শিল্পে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনকে দিন আভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম,একটি ব্যাপক প্রসারমান ব্যবসা বাণিজ্যে পরিণত হতে চলেছিল। পর্যটনের সূত্র মতে যে দেশের আভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম সুন্দর অবকাঠামোতে দাঁড়িয়ে যাবে সেখানে বিদেশী পর্যটকদের আগমন ঘটতে থাকবে ব্যাপকভাবে। বস্তুত বাংলাদেশ ইনবাউন্ড ট্যুরিজম ২০১৩ সালে একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেসামাল এবং শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছিল। সেখান থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইনবাউন্ড ট্যুরিজম এর একটা চমৎকার ক্ষেত্র তৈরি হতে চলেছিল যার ফলে পর্যটন উদ্যোক্তারাও দিনের-পর-দিন সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছিল। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের আউটবাউন্ড ট্যুর এবং ইনবাউন্ড ট্যুর এর একটি বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছিল। ধীরে ধীরে এই আউটবাউন্ড ট্যুরের ক্ষেত্রটি সম্প্রসারিত হয়ে সমগ্র দেশের জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। দেখা গেছে বাংলাদেশের ট্যুরিস্টরা দক্ষিণ এশিয়ার তথা সমগ্র এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও ইউরোপ আমেরিকায় একটি বড় অংশ তাদের ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে উদ্ভিদ হতে শুরু করেছিল। অপ্রিয় হলেও সত্য পোশাক শিল্পের মতো বাংলাদেশ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি বিশেষ স্তরে প্রবেশ করতে যাওয়া ঠিক আগ মুহূর্তে বৈশ্বিক মহামারী করোনার করাল থাবা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে বাংলাদেশের সকল নতুন উদ্যোক্তাদের। বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান পর্যটন কর্পোরেশন তার কিছু প্রথাগত দায়িত্ব পালন এই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কর্মকাণ্ডে। যখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পর্যটন বিকাশে নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছিল ঠিক তখন এই নড়েচড়ে বসেছিল বাংলাদেশের পর্যটন কর্পোরেশন। সেই নড়েচড়ে বসার কারণে ২০১০ গঠিত হয় পর্যটন বোর্ড। যার কর্মকাণ্ড তেমন চোখে পড়ার মতো নয়।যদিও হাজার ১৯৯৯ সালে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করা হলেও তার যথাযথ ব্র্যান্ডিং অথবা প্রমোশন দেশব্যাপী তেমন কারো চোখে পড়েনি।যা শুধু সীমাবদ্ধ ছিল রাজধানীর মধ্যেই। বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে ২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা শুরু হয় এই পর্যটন বিকাশ এর সমস্ত কর্মকাণ্ডের এবং সেখানেই নড়েচড়ে বসেন পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল বিভাগ।যার ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালে আবার ঘোষিত হয় পর্যটন বর্ষ এই পর্যটন বর্ষ কে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যটন বোর্ড সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপক প্রচার প্রচারণায় নেমে তার ক্যাম্পেইন করে একটা সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেবার চেষ্টা করেন।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (বি ইউ টি টি সি) তাদের ২০১৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বিশ্বের যে বৃষ্টি দেশ পর্যটনশিল্পে আগামী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
আমাদের এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর যার নিজস্ব কোন রিসোর্স নেই বললেই চলে তবুও তাদের নিজের তৈরি করা অবকাঠামো দিয়ে তাদের দেশের জাতীয় আয় করে থাকে এই পর্যন্ত থাকে তার পাশাপাশি তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে জাতীয় এর ৬৫% হংকংয়ের ৫০% ফিলিপিনের ৫০% এবং থাইল্যান্ডের ৪০% জাতীয় অর্জুন এই পর্যটন খাত থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালদ্বীপ শ্রীলংকা এবং সুইজারল্যান্ড ভুটান পর্যটনশল্পে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত তাদের প্রতিটি প্রদেশকে সমগ্র বিশ্বে তুলে ধরার জন্য আলাদা আলাদা প্রাদেশিক পর্যটন বোর্ড গঠন করে নিজস্বভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করে সমগ্র বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করে চলেছে এবং তারা তাদের জাতীয় আয় ২৫% এই পর্যটন খাত থেকে তুলে নিয়েছে ইতিমধ্যে তাদের আগামী বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ দিকে।

বাংলাদেশ সম্প্রতি যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে তার মজবুত ভিত্তিমূলে হয়েছিল ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা। বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সমন্বয় সাধিত হলে বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে একটা জাতীয় আয় এর একটি সহায়ক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হতো। তবে তার পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে যেমন বাংলাদেশের তথা বিশ্বের সর্বোচ্চ লম্বা সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের কে নিয়ে বর্তমান সরকারের যে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা তার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হচ্ছে মেরিন-ড্রাইভ-রোড যা চোখে পড়ার মতো এক বিশাল অবস্থান দখল করেছে দেশীয় পর্যটকদের তার পাশাপাশি নতুনভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন রকম বনাঞ্চল তথা সরকারি উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। রাঙামাটি বান্দরবান খাগড়াছড়ি এই অঞ্চলের নীলাচল নীলগিরি কাপ্তাই ও সাজেক তা উল্লেখ করার মতো। এছাড়াও ভাটি অঞ্চল খ্যাত কিশোরগঞ্জের নিকলি মিঠামইনের হাওড়,সিলেট-সুনামগঞ্জের রাতারগুল, হাকালুকি হাওর, উত্তর বঙ্গের চলনবিল পঞ্চগড়ের চা বাগান সহ সাড়া দেশে গড়ে উঠছে বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক পর্যটন স্পট। সরকারি উদ্যগে গড়ে ওঠা সাফারি পার্ক গুলোকে কেন্দ্র করে যে আবকাঠামো গড়ে উঠেছে তাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পর্যটনের এই খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার টুরিস্ট পুলিশ বিভাগ সৃষ্টি করেছে তা প্রশংসার দাবী রাখে।তবে তার টুরিস্ট পুলিশের কর্মকাণ্ড সারাদেশ ব্যাপী আরো বিস্তৃত করা এখন স্ময়ের দাবী।

বর্তমান এই সম্ভাবনার সেক্টরটিকে. মহামারী করো না অনেকটা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেছে। বিশেষ করে এই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের পর্যটন খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির অনিশ্চয়তা সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনের ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। সরকারের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে প্রদর্শিত হয়েছে তার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পকে  প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনার আওতায় আনা জাতীয় জন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এবং এই প্রণোদনা কে সঠিক বাস্তবায়ন এর জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা এবং তদারকি বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পরিচিত মহলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পর্যটন শিল্পকে এই করোনা কালীন বিশেষ প্রণোদনার আওতায় না আনা গেলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে।আর তার পাশাপাশি বেকার সমস্যা সমাধানের এই পর্যটন শিল্প যে ভূমিকা রেখেছিল সেখানেও একটি বড় রকম ধাক্কা খাবে বলে পর্যটন বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাই এ মুহূর্তে পর্যটন বান্ধব সবাইকে নিয়ে একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

লেখক:মেহেদী হাসান সোহেল

পর্যটন বিষয়ক উদ্যোক্তা

সাধারণ সম্পাদক, গাজীপুর সিটি প্রেসক্লাব।