ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২

নন্দাদেবী এক্সপ্রেস, যে ট্রেনে সবাই ট্রেকার!-সজল জাহিদ

ঢাকা থেকে যখন কলকাতা-দিল্লী হয়ে দেরাদুন যাওয়া আর আসার টিকেট করছিলাম, কয়েকটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়েছিল আমাকে। যার মধ্যে অন্যতম হল আমার যেহেতু সময় কম তাই ঢাকা-কলকাতা ট্রেন বা বাসে করলেও। সময় বাঁচাতে কলকাতা থেকে দিল্লী আর দিল্লী থেকে কলকাতা এয়ার টিকেট করেছিলাম। আর বিশেষ সৌভাগ্যের কারনে কিনা কে যাবে রিটার্ন টিকেট পেয়েও ছিলাম বেশ কমদামে।

কলকাতা-দিল্লী-কলকাতা ৫২০০ রুপীতেই। যা টাকায় রূপান্তরিত করলে ৬৫০০ লেগেছিল! আর দিল্লী থেকে দেরাদুন যাওয়া আসার ট্রেন টিকেট করতে চেয়েছিলাম এমনভাবে যেন জার্নির কষ্ট না থাকে আবার ট্রানজিট নিয়েই অনেক লম্বা সময় অপেক্ষার বিরক্তি বা একদম সংক্ষিপ্ত সময়ের একটা থেকে আর একটা বাহন ধরার তাড়াহুড়ো আর টেনশন না থাকে।

এই কম্বিনেশন ঠিক রাখতে গিয়ে আর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত পুরনো দিল্লী ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা থেকে ওয়েটিং লিস্ট হয়ে যাওয়ার পরেও নন্দাদেবী এক্সপ্রেসের টিকেট করেছিলাম এসি থ্রি টায়ারের। উল্লেখ্য যে এই ট্রেনে কোন নন এসি কামরা নেই আর এটাই একমাত্র সুপার ফার্স্ট ট্রেন যেটা দিল্লী থেকে প্রায় মধ্যে রাতে ছেড়ে একদম ভোঁরে দেরাদুন পৌঁছে যায়।

আর এই ট্রেনের লেট হবার তেমন কোন রেকর্ডও নেই। তার মানে ঘুমিয়ে যদি যেতে নাও পারি খুব ভোঁরে তো পৌঁছে যাবো এটাই আমার কাছে অনেক। পরে দেরাদুন পৌঁছে নিজের গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে যতদ্রুত রওনা হওয়া যাবে। আর বিশেষ করে ট্রেনের নামটাও ভীষণ ভালো লেগেছিল নিঃসন্দেহে।

কিন্তু ভাগ্য আমার শুধু সুপ্রসন্নই নয়, ভীষণই সুপ্রসন্ন যে কারনে এই ট্রেনে আমার যাত্রা শুরুর একদিন আগেই ট্রেনমেন থেকে জানতে পেরেছিলাম আমার সিট শতভাগ কনফার্ম হয়ে গেছে! ওয়েটিং লিস্ট থেকে সিট র্যা কে না থেকে কনফার্ম হয়ে যাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তো পুরনো দিল্লীর স্বনামে খ্যাত করিম’সে রাতের ডিনার শেষ করে একটা প্যাডেল রিক্সা ৩০ রুপী দিয়ে ভাড়া করে হেলেদুলে পৌঁছে গেলাম নিউ দিল্লী স্টেশনে। বাইরের বাথরুম কাম ওয়াশরুমে গোসল সেরে লকার থেকে ব্যাগ নিয়ে নির্ধারিত প্লাটফর্মে চলে গেলাম, নিজের ট্রেন আর কামরার খোঁজ নিতে।

প্লাটফর্মে গিয়ে দেখি ট্রেন নির্ধারিত যায়গায় দাড়িয়ে আছে। কিন্তু কোথাও কোন চার্ট নেই, যেটা সাধারনত অন্যান্য ট্রেনের ক্ষেত্রে প্লাটফর্মে লাগানো থাকে। কিন্তু এখানে সেটা নেই। অনেক খুঁজেও কোন চার্ট না পেয়ে ভাবনায় পরে গেলাম সিট কোন কামরায় হবে আমার। একজন আমাকে গুগলে কিভাবে কোন কামরায় সিট সেটা খুঁজে পাবার উপায় দেখিয়ে দিলেন।

ব্যাস আমিও পেয়ে গেলাম আমার নির্ধারিত কামরা আর সেই কামরার কোন সিট সেই নাম্বার। ততক্ষণে পুরো ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীরা এসে এসে প্লাটফর্মে পৌঁছে গেছে। আর এদের মধ্যে যাদেরকে চোখে পড়ছে তাদের কাউকেই সাধারন যাত্রী বলে মনে হলনা। সবাই কেমন যেন কমন যাত্রী, ঠিক যেমন আমি নিজের ব্যাকপ্যাক নিয়ে আছি, সবাই তেমন করেই আছে।

আমি কি ভুল বুঝছি নাকি চোখে ভ্রম দেখছি? সেই কৌতূহল মেটাতে প্লাটফর্মের অন্যান্য দিকে এগিয়ে চোখ বোলাতে লাগলাম আর ভীষণ অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম যে আসলেই এই ট্রেনে একদম সাধারন যাত্রী এক জনও নেই। সবাই ব্যাকপ্যাক যাত্রী, সবাই শর্ট প্যান্ট, টি শার্ট আর বুট বা কেডস পরে আছে আর হাতে বা ব্যাগের সাথে সবারই একটি বা দুটি ট্রেকিং পুল বা সটীক। কেউ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে, কেউ অফিসের সহকর্মীরা মিলে, কেউ পরিবার বা ভাইবোন মিলে ট্রেকিং এ যাচ্ছে। খুব আর খুব মজা পেলাম এদের সবাইকে দেখে।

এদের দেখে দেখে নিজের নির্ধারিত কামরার কাছে চলে এলাম। সেখানেও সবাই যার যার ব্যাকপ্যাক কাঁধে বা নিচে রেখে পুল নিয়ে, হাতে পানির বোতল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। পরে নিজের কৌতূহল মেটাতে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম কে কোথায় যাচ্ছেন? জানলাম কেউ রূপকুণ্ড ট্রেক, কেউ হেমকুণ্ড, কেউ রুপিন পাস, কেউ স্টক কাংরি, কেউ উত্তরকাশী, কেউ যমুনাত্রী, কেউ হৃষীকেশ, কেউ হরিদুয়ার, কেউ রুদ্র প্রয়াগ আর কেউ কর্ণ প্রয়াগ। মোট কথা যতগুলো টিমের সাথে এখন পর্যন্ত কথা বলেছি সবাই কোন না কোন ট্রেকিং রুটে যাচ্ছে ধর্মীয় বা নিজের আত্ন তৃপ্তির পাহাড় পাহাড়ে হাটার জন্য।

এদের সবাইকে দেখে এতো ভালো লাগলো যেটা বলে বোঝানোর নয়। এমনটা আগে কখনোই দেখিনি যে একটি ট্রেনের সকল যাত্রীই ট্রেকিং এ যাচ্ছে যে যার মত করে আলাদা আলাদা গন্তব্যে। ট্রেন ছাড়ার ঠিক ১৫ মিনিট আগে দরজা খুলে দেয়াতে সবাই যে যার মত করে উঠে পরে যার যার সিটে গিয়ে ব্যাগপ্যাক রাখলাম। মোবাইলটা অনেক ঝামেলা করে চার্জে দিতে দিতেই দেখলাম সবাই যে যার মত করে বিছানা করে শুয়ে পরার আয়োজন শেষ করে ফেলেছে।

সবার দেখা দেখি আমিও নিজের সিটে রাখা কম্বলের প্যাকেট খুলে, চাদর বিছিয়ে, বালিশে মাথা রেখেছি মনে পরে। এরপর আর কিছু মনে নেই, কিছুইনা। আহা হিম ঠাণ্ডায়, ওম কম্বলের ভিতরে, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এমন ঘুম হল যে ঘুম ভাঙলো একদম দেরাদুন পৌঁছে যাওয়ার পরে অন্যান্য যাত্রীদের নেমে যাবার প্রস্তুতির কলকাকলিতে।

 

ঝটপট নিজের ব্যাগ গুছিয়ে, মোবাইলের চার্জার খুলে, ব্যাগ কাঁধে করে ট্রেন থেকে নেমে একদমই নতুন একটি প্রদেশের নতুন একটি রাজধানী দেরাদুনে। আহা অনেক দিনের স্বপ্ন দেখা দেরাদুনে। দ্রুত বাস স্ট্যান্ডের পথ ধরলাম, আজকের মধ্যে আমাকে গাংগোত্রী বা উত্তরকাশী পৌঁছে যেতে হবে। তবে মনে গেঁথে গেছে নন্দাদেবী এক্সপ্রেসের অনন্য অভিজ্ঞতা।আহ কি দারুণ, নন্দাদেবী এক্সপ্রেস, যে ট্রেনের সবাই ট্রেকার।