ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২

নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দ্বারে দ্বারে….

যখন শান্তিনিকেতনের মূল প্রাঙ্গনে প্রবেশ করি তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে বেশ আগেই। চারদিকে একটা আলো আঁধারের খেলা। হাটতে হাটতে আমরা বকুল বীথির প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়ালাম। শান্তিনিকেতনের একজন গাইড কাম কর্মচারীর কাছে শুনছিলাম এই বকুল গাছগুলো রবীন্দ্রনাথ নিজে হাতে লাগিয়েছিলেন। সন্ধা নামার কারনে বকুল বীথিতে ঘন কালো ছায়া নেমেছিল।

সেখানে বেশ অনেক্ষন দাড়িয়ে থাকলাম। এখানে কবি তার ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস নিতেন। যেন ছায়ায় বসে রৌদ্রের তাপকে আড়াল করে আরামে ক্লাস করতে পারেন, সেই ইচ্ছা থেকেই এই বকুল বীথির আয়োজন করেছিলেন তিনি। বিশাল একটা এলাকা জুড়ে বকুল বীথির অবস্থান। অসংখ্য বকুল গাছ ঠায় দাড়িয়ে আছে সেই আমল থেকেই। এখানকার শিক্ষার্থীদের আরামের আর আয়েসের ছায়া হয়ে।

এরপর দেখলাম, লাল ধুলো ওড়া মাটির পথ। যেটা নাকি সেই বিখ্যাত গানের সূচনার যায়গা। এই রাঙা মাটির পথে দিকে তাকিয়েই তিনি লিখেছিলেন “গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ!” অনেকক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিলাম সেই পথের পানে। ইচ্ছে করেই পা দিয়ে একটু রাঙা ধুলো উড়িয়েছিলাম। পায়ে মেখে ছিলাম।

যদিও মনে মনে প্রশ্ন এসেছিল এই প্রায় শহুরে লোকালয় কিভাবে গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ হয়েছিল। বলিহারি যাই নিজের অপরিপক্ক ভাবনার। নিজেকে নিজেই বলি আরে গাধা, হাঁদারাম আজ থেকে শত বছর আগে কি এখানে কোন লোকালয় ছিল নাকি? এটা তো তখন নিখাদ এক গ্রাম ছিল রে। অবশেষে চেতনা ফিরে পেলাম হ্যাঁ সত্যিই তো সেই সময় তো এটা গ্রাম ছাড়া রাঙা মাটির পথই ছিল বটে।

দেখলাম সেই তালগাছ যেটা দেখে দেখে তিনি ছোটদের জন্য লিখেছিলেন “তালগাছ এক পায়ে দাড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে” দেখলাম বিখ্যাত ছাতিম তলা। যেখানে ছাতিম গাছের তলায় বসে আরাম করতেই তিনি ও তার পূর্ব পুরুষ। প্রথম গড়া স্কুল ঘর, লাইব্রেরী, বসত বাড়ি, কাছারি, সব ধর্মের জন্য সমানভাবে তৈরি বাড়ি। যেখানে যে কোন দেশের আর যে কোন ধর্মের অতিথিরা এলে থাকতেন। দেখলাম জওহারলাল নেহেরু মঞ্চ, যেখানে বসে বা দাড়িয়ে সমাবর্তনের মত সবচেয়ে বর্ণিল আর গুরুত্তপূর্ণ সমাবেশের মঞ্চ বসে বা ভাষণ দিতেন এবং এখনো দেন দেশের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিবর্গ।

শেষ সন্ধার পরে যখন রাতের আঁধার নেমেছে তখন আলো আধারির মাঝে জোনাকির মত জ্বলে ছিল তার যাদুঘর। যেটা চার দেশের চার রকম ঐতিহ্য নিয়ে তৈরি হয়ে যুগের পর যুগ ঠায় দাড়িয়ে আছে। ইতালির মার্বেল পাথর, বেলজিয়ামের কাচ, জাপানি অবকাঠামো আর ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ছাপ। সেদিন বুধবার ছিল বলে আর ভিতরে ঢোকা সম্ভব হয়নি। তাতে খুব একটা আফসোস না হয়ে বরং ভালো লেগেছে যে, এই আক্ষেপ ঘোচাতে আর একবার সময় নিয়ে আসার সুযোগ থেকে গেল।

এরপর হেটে হেটে গেলাম ব্রিটিশদের কোর্ট বা আদালত প্রাঙ্গনে। যেখানে সাধারণ মানুষের ফৌজদারি অপরাধের বিচারকার্য সম্পন্ন হত। সেই বিশাল মাঠ, গির্জা, আদালত ভবনসহ পুরনো ঐতিহ্যের ঘণ্টা। যে ঘণ্টা বিভিন্ন উপলক্ষ বা বড় ধরনের কোন বিপদে বেজে উঠতো আর এখনো বাজে সময় আর প্রয়োজনে।পুরো শান্তিনিকেতনের যেখানেই গিয়েছি একটা ব্যাপার খুব মজা লেগেছে সেটা হল, মূল ক্যাম্পাসের ভিতরে কোন রিক্সা নেই। প্রতিটা ছেলে-মেয়ের কাছে আর কিছু থাকুক আর নাই থাকুক, একটি করে সাইকেল আছে প্রত্যেকের। এখানে ছেলে মেয়েদের রাত আটটা পর্যন্ত বাইরে থাকার নিয়ম আছে। আটটার মধ্যে যে যার হোস্টেলে চলে যেতে বাধ্য।

প্রত্যেকে যার যার সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্ধু বা বান্ধবীর সাথে। কেউ হয়তো দুই সাইকেল এক যায়গায় রেখে কোন গাছের তলায় বসে গল্প করছে, কেউ সাইকেল চালিয়েই পুরো ক্যাম্পাসের এক মাথা থেকে হয়তো আর এক মাথা চষে বেড়াচ্ছে অবিরত। সবাই দারুন স্বাধীন, মুক্ত আর কোন রকম জড়তাহীন, যেটা দেখে খুব ভালো লেগেছে। এখানে কেউ কাউকে নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করার মত সময় বা মানসিকতা নেই। সবাই যে যার ভালোলাগাটা নিজের মত করে খুঁজে নিয়ে জীবনটাকে দারুনভাবে উপভোগ করছে।

বাইরের কোন আড্ডা নেই, বখাটেদের কোন উৎপাত নেই, রাজনৈতিক কোন মিটিং মিছিল নেই, দলীয় কোন কোন্দল নেই। সবাই মুক্ত, সবাই স্বাধীন, সবাই বাধাহীন, উন্মুক্ত পরিবেশ আর সংস্কৃতিতে দীক্ষা নিচ্ছে মুক্ত মনে। রাত তখন বেশ অনেকটা হয়ে গেছে বুঝতে পারলাম শীতের প্রকোপ আর অন্ধকার ঘনিয়ে আসায়। দিনে একটুও শীত ছিলোনা বলে তেমন কোন গরম কাপড় নিয়ে বের হওয়া হয়নি। অথচ সব ব্যবস্থা সাথেই ছিল কিন্তু রুমে রেখে আসাতে নিজেদের উপরেই নিজেদের রাগ বাড়তে লাগলো। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি রুমে ফেরার তাগিদে।

কিন্তু সেটা না করে, শেষ বিকেলে যে নাটক দেখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, সেটা রক্ষা করা আর একটু মঞ্চ নাটক দেখার লোভে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে ঢুকে পরলাম। বেশ কিছু সময় নাচ আর আলোচনা দেখার পড়ে ভালো লাগা সত্ত্বেও ভ্রমণ সঙ্গীর ইচ্ছা না থাকায় উঠে যেতেই হল, ফেরার পথ ধরতেই হল।

কিন্তু চাইলেই কি আর এসব ইতিহাস, আবেগ আর অনুভুতি সম্পন্ন যায়গা থেকে চলে যাওয়া যায়? যে কারনে কোন রকম বাহন না নিয়ে পায়ে হেঁটেই সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। কয়েক মিনিট হাঁটতেই বাজারেরকাছে পৌঁছে গেলাম। সেখানে একটু ক্ষুধা নিবারন আর উষ্ণতার আরাম পেতে গরম গরম মম, সুপ আর চায়ের মত সব উষ্ণতা বিলানো খাবারে নিজেদের সম্পৃক্ত করলাম কিছু সময়ের জন্য। বেশ আয়েশ করে খেয়ে দেয়ে, একটি টোটো নিয়ে বীরভূম বাসস্ট্যান্ড ঘুরে পরদিন সকালের আসানসোল যাবার বাসের খোঁজ খবর নিয়ে এলাম।

রুমে ফিরে ফ্রেস হয়ে রাতের জন্য অর্ডার করে যাওয়া খাবার খাবার খেতে নিচের ডাইনিং এ চলে গেলাম। গরম ভাত আর রুই মাছের কারি। ওয়াও কি যে সুস্বাদু, মজাদার, স্পাইসি আর তৃপ্তি দায়ক একটা খাবার ছিল বলে বোঝাবার মত নয়। সেটাও মাত্র ৪৭ টাকা মুল্যের, ভরপুর ডিনার, মাছ-ভাতের সাথে লেবু, ডাল, সালাদ, কাঁচা লঙ্গা সমেত অপূর্ব একটা খাবার।

খেয়ে রুমে গিয়ে শুধু বিছানায় গা এলিয়ে ছিলাম মনে আছে। এরপর চোখ মেলে দেখি সকাল! এতোটাই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আর নির্ঘুম গত রাত আর পুরোদিন কাটিয়েছিলাম, তার উপর আগের দিনের সারাদিনের অফিসের বিরামহীন কাজের চাপ তো ছিলই। তাই কখন শুয়েছি আর কখন ঘুমিয়ে পরে এক ঘুমে সকাল বানিয়ে ফেলেছি কিছুই জানা ছিলোনা। চমৎকার একটা ঘুম শেষে সকল ক্লান্তি দূর করে চোখে মেলে দেখলাম এক স্নিগ্ধ শান্তিনিকেতনের শিশির ভেজা শেষ শীতের সকাল।

এমন অপূর্ব এক সকালে গাছে গাছে, পাতায়, পাতায়, ঘাসে ঘাসে, শিশির জড়ানো সকাল দেখতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই পথ ধরেছিলাম বিদ্রোহী কবি, আমাদের জাতীয় কবি, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভুমি যা এখন কবি তীর্থ নামে পরিচিত, সেই আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামের দিকে।

অনেকদিন থেকে আমার নিজের কাছেই নিজের লেখাগুলো কেমন যেন একঘেয়ে লাগছিল। সেই পাহাড়, অরণ্য, মেঘ, কুয়াশা, ঝর্ণা, সবুজ, চা-বাগান। এসব নিয়ে লিখতে লিখতে একটা কেমন যেন অসস্থি লাগছিল। মনে মনে লেখার একটু ভিন্ন স্বাদ খুঁজতে লাগলাম। কিভাবে পাই ভিন্ন কিছু লেখার উপায় আর আনুষঙ্গ? এই ভাবনা ভাবতেই ভাবতেই হুট করে একদিন প্রিয় নজরুল সঙ্গীত শুনতে শুনতে মনে হল, আরে ভিসা তো এখনো আছে বেশ কয়েক দিনের। তাহলে একটু প্রিয় নজরুলের জন্ম ভিটা আসানসোলের চুরুলিয়া ঘুরে আসা যেতে পারে দুই দিনের জন্য।

এই ভাবনা ভাবতেই আবারো মাত্র এক মাস যেতে না যেতেই ভ্রমণের পাগলামিটা অস্থির করে তুলল। ভাবলাম দুই দিনের ছুটির সাথে আর এক দুইদিন ম্যানেজ করে তবে একই পথের রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন তবে কেন বাদ যাবে? বাহ, মনের মধ্যে দারুণ একটা উত্তেজনার পারদ উপরের দিকে উঠতে লাগলো। চমৎকার চারদিনে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নজরুলের চুরুলিয়া ঘুরে আসা যাবে। ভিন্নধর্মী আর নতুন কিছু লেখার জন্য এদের দুজনের চেয়ে ভালো আর প্রভাবক আর কেই বা হতে পারে?

এরপর থেকেই বাসায় ছুঁক ছুঁক করতে লাগলাম। কিভাবে চারদিনের ভিসা ম্যানেজ করা যায়? একমাসও হয়নি ডুয়ার্স-দার্জিলিং ঘুরে এলাম। এখন বাসায় এমন অবাস্তব প্রস্তাব দিলে নির্ঘাত সে বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে নয়তো আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে! তবুও নতুন ভ্রমণের ভাবনার পালে সুখের একটা শিরশিরে হাওয়া লাগতে লাগলো। আর সেই সাথে কি উপায়ে বাসার ভিসার ব্যাবস্থা করা যায় সেটাও দারুণ ভাবিত করে তুলল।

আমার ভালোবাসার ভাবনায় আশীর্বাদ হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি এলেন কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে। ব্যাস আমাকে আর পায় কে। ওনারা যেহেতু আছে সেহেতু নিমরাজী করে হলেও ম্যানেজ করে ফেলতে পারবো। হালকা ঘুসটুস দিয়ে হলেও। ব্যাস বেশ সপ্তাহ খানেকের অদম্য চেষ্টায় বাসার ভিসাও হয়ে গেল, গোমড়া মুখে হলেও। আহ আর রুখবে আমায় কে?

আর এক পাগুলে ভ্রমণকারীকে সঙ্গী করে চিত্রা এক্সপ্রেসের টিকেট কেটে, অফিস শেষে কমলাপুর গিয়ে উঠে পরলাম ট্রেনে। ট্রেনের দারুণ ভিড় ঠেলে নিজেদের সিটে বসে পরেই নানা রকম পরিকল্পনা ফাঁদতে বসলাম দুজনে। শান্তিনিকেতন, চুরুলিয়া ঘুরে দেখেও একদিন হাতে থাকছে, তাহলে সেইদিন কোথায় আর কিভাবে কাটানো যায়?

এই ভাবনায় এলো, বিহারের পাটনা, ঝাড়খণ্ড এর রাঁচি আর এলো মুর্শিদাবাদের জমিদার বাড়ি। পরে ঠিক হলো, আগে শান্তিনিকেতন আর চুরুলিয়া ভ্রমণ শেষ করে সময় সাপেক্ষে পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা যাবে। সেভাবেই ট্রেনের আলোচনা শেষ করে স্টেশনে স্টেশনে কোথাও চিপস, কোথাও কলা-রুটি, কোথায় পেয়ারা আর কোথাও সেদ্ধ ডিম আর চায়ের আসর জমিয়ে শেষ রাতে যশোর গিয়ে পৌছালাম।

যশোর স্টেশনে দাড়িয়ে থাকা বাসে ১ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম বেনাপোল। মাত্র ১০ মিনিটে বাংলাদেশ আর ভারতের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস শেষ করে সকাল ৭:৩০ এ বনগাঁ এর সিএনজিতে চেপে বসলাম। ২০ মিনিটে বনগাঁ পৌঁছে বনগাঁ লোকালের টিকেট কেটে নিলাম শিয়ালদাহ পর্যন্ত। এরপর গরম লুচি-মিষ্টি দিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে স্টেশনে দাড়িয়ে থাকা বনগাঁ লোকালের জানালার পাশের সিট দখল করে বসে পরলাম। আহ আরও একবার ভারত ভ্রমণের স্বাদ যুক্ত হতে লাগলো। ভিন্ন লোকেশন, ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন অভিজ্ঞতা, নতুন গল্প আর আমার দারুণ সস্থি। এইসব ভাবতেই ভাবতেই ঠিক ১০ টায় ছেঁড়ে দিল বনগাঁ থেকে শিয়ালদহর বনগাঁ লোকাল।

আমাদের গন্তব্য শিয়ালদাহ থেকে বোলপুরগামী যে কোন ট্রেন ধরা বা শিয়ালদাহ থেকে হাওড়া গিয়ে শান্তিনিকেতনের ট্রেনে ওঠা। যেটা আগে পাই সেটাইতেই আমরা সুযোগ নেব। যতটা আগে শান্তিনিকেতন পৌঁছে যাওয়া যায় ততই আনন্দ আমাদের। ট্রেনে বসে ভাবতে লাগলাম, কেমন অনুভূতি হবে শীত শেষের শান্তিনিকেতনে?

আগের রাতের লোকারণ্য চিত্রা এক্সপ্রেসে ঘুম হয়নি বললেই চলে বা আমাদের দুজনের কেউই ঘুমাইনি। যার কয়েকটা কারন আছে।

এক, পুরো জার্নিতে যশোর পর্যন্ত যেতে যতগুলো স্টেশনে ট্রেন থেমেছে সব গুলোতেই আমরা নেমেছি।

দুই, পুরো জার্নিটা দারুণ গল্পে আর কথায় কাটিয়েছি।

তিন, ঘুম যদি না ভাঙে তখন শেষে না আবার যশোরের পরিবর্তে খুলনায় গিয়ে পৌছাই। শেষে তাড়াতাড়ি বর্ডার পার হয়ে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিয়ালদাহ পৌছাতে পারবোনা সেই ভয়ে।

যে কারনে বনগাঁ লোকাল দ্রুত লয়ে ছুটে চলা শুরু করতেই ট্রেনের প্রিয় দুলুনিতে ঘুমের অতলে ডুবে গিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙলো দুই দাদার একটু কটু কথা শুনে।
আমার ভ্রমণ পার্টনারকে দাড়িয়ে থাকা একজন বলছেন…

“ও দাদা আর কতক্ষণ বসে থাকবেন? এবার একটু উঠুন, আমাদের বসতে দিন”
পার্টনারের উত্তর, “দাদা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সারারাত ঘুমোতে পারিনি আর ৩০ মিনিট ঘুমিয়ে নেই তারপর উঠবো!”

এই কথা শুনেই ওপারের দাদারা গেলেন ক্ষেপে, স্বাভাবিক ভাবেই, “আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তো আমরা কি করবো, এখানে পুরো পথ কেউ বসে যায়না, আপনি উঠুন অন্যকে বসতে দিন!’

আমি শুনছি আর ঘুমের ভান করে মরার মত পরে থেকে আমার পার্টনারকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারছি, আর মনে মনে ব্যাটা আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সারারাত ঘুমোতে পারিনি, সেকথা বলার কি আছে? ওরা যা বলছে বলুক, তুমি চুপ মেরে বসে থাকোনা কেন হে?

কিন্তু যেই তাকে উঠতে বলছে তাকেই সে একই কথা বলে ওদের রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে! কেন যে বুঝতে পারছেনা, চুপ করে বসে থাকাই সবচেয়ে ভালো। উহ!

তার একটু পরে আমাকে ডাকাডাকি, ঠেলা আর খোঁচাখুঁচি শুরু করলো ঘুম থেকে তুলে বসার জন্য। কিন্তু আমি মামা সেই জিনিষ, বাসাতে শুক্র-শনিবার ছেলে আর ছেলের মা-ই ডেকে তুলতে পারেনা আর তোরা তো কোন ছাড়!

একদম ঘুমের ভান করে মটকা মেরে ঘার ক্যাঁৎ করে, সিটের সাথে সিটিতে রইলাম! এদিকে আমাকে ডাকাডাকি দেখে আমার পার্টনার বাংলা-হিন্দি আর ইংরেজির অভাবনীয় নতুন এক মিশ্রণে বলা শুরু করলো…

“উনি সিক, রাতমে নেহি ঘুমায়া, ডাইকেননা!”

শালার, কি যে করি? ওনার এই ডায়লগ শুনেই আমার পেট ফেটে প্রায় হাসি এলো বলে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামাল দিলাম।

কিন্তু ওনাদের অত্যাচারে অবশেষে আমার পার্টনারকে তার সিট ছেঁড়ে উঠে দাড়াতেই হল, কিন্তু আমি বেশ আরামেই বসে আর চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম।

অবশেষে শিয়ালদাহ আসতে যখন আর মাত্র ১৫ মিনিটের মত বাকি, তখন দাদাদের অনলবর্ষী মুখের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চোখ মেলে তাকালাম! এক দাদা বললেন, দাদা একটু কি উঠে বসতে দেবেন?

আমি বললাম কি যে বলেন আপনাদেরই তো সিট, আপনারা বসবেননা তো কে বসবে? বসুন বসুন বলে উঠে দাঁড়ালাম। দাদারা দারুণ খুশি হয়ে আমার পার্টনারকে বলতে লাগলেন…

দেখুন দাদা, এই দাদা ঘুম থেকেই উঠেই ওনার সিট ছেঁড়ে দিল আর আপনি জেগে থেকেও সিটটা ছাড়লেননা বলার পরেও। আর ছাড়লেন কখন? সেই যখন প্রায় শিয়ালদাহ চলে এসেছি তখন!

আমার পার্টনার মুচকি হাসে আর আমিও মুচকি হাসি। শিয়ালদহ নেমে খোঁজ নিয়ে জানলাম প্রায় দুই ঘণ্টা পরে এখান থেকে বোলপুরের ট্রেন ছাড়বে। ততক্ষণ এখানে বসে না থেকে ৭ রুপী ভাড়া দিয়ে বাসে করে চলে গেলাম হাওড়া স্টেশনে, মাত্র ১৫ মিনিটে। কারন হাওড়া থেকে প্রতি ঘণ্টায় শান্তিনিকেতনে ট্রেন ছেঁড়ে যায়।

হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেই পরলাম স্টেশন চেকারের খপ্পরে। প্লাটফর্ম টিকেট দেখতে চায়? আজব টিকেট কাউনটারই তো খুঁজছি তো আবার কিসের টিকেট দেব? বেশ কয়েকবার বুঝিয়ে বলার পরে কোনদিক থেকে টিকেট কাটবো সেট দেখিয়ে দিতেই দৌড় লাগালাম। মূল কাউন্তারে যাবার আগেই চোখে পড়লো ডিজিটাল মেশিন দিয়েও টিকেট কাটার ব্যবস্থা আছে। অভিনব এই ব্যবস্থা দেখে ডিজিটাল মেশিনে বোলপুরের সুপার ফার্স্ট ট্রেন শহিদ এক্সপ্রেসের টিকেট কাটলাম ৮০ রুপী করে।

তখন বেলা ১১:৩০ বাজে। সময় আছে আর দুপুরে খাবার দেরি হয়ে যাবে দেখে আবারো আলুরদম আর লুচি ভাঁজা কেনা হল ২০ রুপী করে। যদিও আমার ইচ্ছা ছিল আমিরতি আর প্যাঁটিস খাবো। কিন্তু ভ্রমণসঙ্গীর পছন্দ কারনে আর তার মিষ্টি নিষেধ থাকার কারনে সাধের আমিরতি আর চেখে দেখা হলনা। সেখানে দাড়িয়েই ট্রেনের সময়সূচী দেখতে দেখতে প্রায় দুপুরের আহার শেষ করে প্লাটফর্মের বিশুদ্ধ পানি খেয়ে আর বোতল ভর্তি করে নিয়েই নির্ধারিত প্লাটফর্মে চলে গেলাম।

ট্রেন তখন প্লাটফর্মে ঢুকছে। থামতেই অন্যদের দেখাদেখি হুড়মুড় করে উঠে পরলাম আর সুন্দর নরম গদির সিট পেয়ে জানালার কাছে বসে পরলাম। সিট দখল করেই পার্টনার ছুটলো হাওড়া স্টেশনে শহীদ এক্সপ্রেস ট্রেনের সাথে সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করতে হবে বলে ছবি তুলতে। এটা তার একটা হবি বলা যায়। প্রতিটা স্পটের আপডেট সেই মুহূর্তেই না দিতে পারলে তার আবার ভ্রমণের পূর্ণতা আসেনা! আমি তার এই কাণ্ড দেখি আর একা একা হাসি। একজন মধ্য বয়স্ক মানুষের কি তারুন্যে ভরপুর আগ্রহ আর উদ্দীপনা।

দারুন দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করলো বোলপুরগামী আমাদের শহীদ এক্সপ্রেস। ঘুমে, জাগরণে, বাইরের নানা রকম হলুদ-সবুজ দৃশ্য দেখতে দেখতে ঠিক ঠিক ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে দুপুর ২:২০ মিনিটে আমরা বোলপুর পৌঁছে গেলাম। মাঝে পথে চলতে চলতেই আমার পার্টনার তার অনেক দিনের ইচ্ছার মুর্শিদাবাদ যাবার বাই রোডের শর্টকাট প্ল্যান করে ফেললেন পাশের সহযাত্রীর সহজগিতায়। তাতে আমাদের বেশ ভালই হয়েছিল কাজ অনেকটা কমে যাওয়াতে। পরবর্তী প্ল্যান গুলো সহজ আর দ্রুত কার্যকরী হয়ে উঠেছিল।

বোলপুর নেমেই একটা টোটো নিয়ে নিলাম ২০ রুপী করে ভাড়া শান্তিনিকেতনের মূল আঙিনা বা বিশ্বভারতী পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য। পথে যেতে যেতেই দুই একটি যায়গায় হোটেল দেখে কম দামে যেটা সামান্য পছন্দ হয়েছিল সেটাতে ওঠার পরে, আইডি কার্ড চাওয়ার পরে, পাসপোর্ট দেয়ার কথা বলাতে বলে সেখানে নাকি বাংলাদেশী রাখেনা! মালিকের নির্দেশ। বেশ ভালো পরে টোটোর ড্রাইভারের পরামর্শমত দারুন একটা হোটেলে গিয়ে মনের মত পরিবেশ আর বেশ সাধ্যের মধ্যের দামেই ৭৫০ রুপীর চমৎকার একটা রুমে উঠে পরলাম, হোটেল শান্তিনিকেতনের।

যেখানে সব সময়ই গরম পানি, ভালো টয়লেট, বেশ সুন্দর ডাবল বেড ছাড়াও বিশেষ যেটা রয়েছে বা পয়সা উসুল বলে মনে হয়েছে সেটা হল হোটেল শান্তিনিকেতনে খোলা বেলকোনি। যেখানে বসেই কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে একবেলা চুপচাপ, চারপাশের সবুজ আর নীরব প্রকৃতির মাঝে নানা রকম পাখির কিচিরমিচির শুনে। নিচে চমৎকার সবুজের গালিচা, নানা রকম ফুলের সমারোহ, সবুজের মাঝে লাল ইটের সরু পায়ে চলার পথ, সবুজ লনের মাঝে ছোট ছোট চেয়ার পাতা রয়েছে সবুজ ছুঁয়ে বসে থাকার জন্য। অথবা সকাল-বিকেল বা সন্ধায় চায়ের পেয়ালায় অলস চুমুক দেয়ার জন্য।

সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য জানিনা, সেদিন ছিল বুধবার আর বুধবারেই নাকি পুরো ভারতবর্ষের শান্তিনিকেতনই কেবল বন্ধ থাকে! অন্যান্য সব রবিবার। যে কারনে সমস্ত বাজার, মার্কেট, যাদুঘর সব বন্ধ! তাই ধীরে ধীরে হোটেল শান্তিনিকেতনে ফ্রেস হলাম দারুণ একটা গোসল দিয়ে। পরে বাজারে কি খোলা পাই বা না পাই তাই হোটেলের মেন্যু দেখে, খাবারের দাম বেশ সাধ্যের মধ্যে পেয়েই রাতের জন্য মাছ আর ভাতের অর্ডার দিয়ে বেরিয়ে পরলাম শান্তিনিকেতন দর্শনে।

একদম ফ্রেস হয়ে, ঝকঝকে পাটভাঙা নতুন কাপড় পরে বের হলাম শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী উদ্দ্যেশ্যে। বিশ্ব কবির প্রানের প্রাঙ্গনে। হোটেলের রাস্তা দিয়ে বাইরের ফটকে বের হতেই ছোট একটা দোতালা বাড়ি চোখে পড়লো। মাধবী না কামিনী যেন নাম। দেখেই একটা অন্য রকম ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল যেন। সরু পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছি ধীরে পায়ে। আর অবাক হয়ে চারপাশটা দেখছি।

সব দোতালা বা তিনতলা বাড়ি, কিন্তু প্রায় প্রতিটি বাড়ির নামই রবীন্দ্রনাথের কোন না কোন কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের নামে! অবাক লেগেছে দেখে। ভাবনা এলো এরা সবাইকি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে তাদের বাড়ির এইসব নাম করন করেছেন নাকি, কোন বাধ্যবাধকতা থেকে? সময় স্বল্পতায় এটা আর কারো কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি। তবে প্রশ্নটা মনে গেঁথে গেছে, এরপর যখন যাবো প্রথমে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।

একটা মাঝারি প্রায় শহুরে ধুলো ওড়া রাস্তা পার হতেই চোখের সামনে বিস্ময়, আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর দারুণ আবেগে পেয়ে বসলো আমাকে। সামনে একটি প্রায় স্বর্গসম বর্ণীল, ঝলমলে, পৃথিবীর সব রকম ফুলে ফুলে সুশোভিত একটা একতলা বাড়ি। প্রায় উন্মাদের মত সেই বাড়ির গেটের কাছে ছুটে গিয়ে মনপ্রান ভরে বেশ কিছু ছবি তুললাম দুজনে।

বেশ চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া গেলনা কথা বলার বা অনুমোদন নিয়ে ভিতরে ঢোকার। শেষে সেই অপূর্ব বাড়িটার পাশ দিয়ে হেটে যাবার সময় পিছনে গাছের পরিচর্যা করছে এমন কাউকে দেখে জানলাম, বাড়ির মালিক কোলকাতার বাসিন্দা। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে এখানে এসে থেকে সবাই মিলে। আফসোস যদি বাড়ির মালিক থাকতেন তবে নিশ্চিত রাজী করাতাম ভিতরটা দেখার জন্য।

সেই আক্ষেপ নিয়েই আবারো সামনে এগোতে থাকলাম। সামনেই গান্ধী ইন্সটিটিউট পেয়ে ঢুকে পরলাম সেখানে।সেখানেও ফুলে ফুলে সেজে আছে সমস্ত মাঠ, রাস্তা আর বাগানে সেজে আছে শত রকমের রঙিন ফুলের সমাহার। অদ্ভুত ভাবে সময় গুলো কেটে যেতে লাগলো। আবারো সাধ মিটিয়ে ছবি তুলে সেখান থেকে বের হতেই, পেট জানান দিল যে ভেতো বাঙালির দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি।

এই কথা মনে পরতেই ক্ষুধা যেন হাউমাউ করে উঠলো! এখনই কিছু না খেলেই নয়। কিছুদূর গিয়ে, কয়েকটা প্রাতিষ্ঠানিক ভবন পেরিয়ে সামনে যেতেই চোখে পড়লো পুলিশের কোন কার্যালয়। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তাদের ক্যাফেতে চাইলে আমরা হালকা নাস্তা বা চা উপভোগ করতে পারি। ঝটপট ঢুকে পরলাম পুলিশ ক্যাফেতে। বেশ গা ছমছমে, গাছে ঘেরা আর ছায়া পরে প্রায় অন্ধকার একটা যায়গা।

সেখানে কেক, বিস্কিট আর তেলে ভাঁজাসহ কয়েক কাপ চা খেয়ে দুজনের সাকুল্যে বিল হল ৩২ টাকা! টাকার পরিমাণ শুনে ঝটপট আরও দুটো করে তেলেভাঁজা নিয়ে নিলাম প্যাকেটে করে আর সাথে এক বোতল পানি ভোঁরে নিয়ে শান্তিনিকেতনের প্রায় ফাঁকা রাস্তায় হাটতে লাগলাম হেলেদুলে। অনেকটা হাটার পরে রাস্তা বাদ দিয়ে, শর্টকার্ট পথে যেতে বিশাল মাঠের বুক চিরে হাটা শুরু করলাম। মাঠ পেরিয়েই চোখে পড়লো নাট্যমঞ্চ। যেখানে তখন নাট্য উৎসব চলছিল। ছবি তোলার ফাঁকে কোন এক অপরিচিত নাট্য ব্যক্তিত্ব সন্ধ্যায় নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন।

নাটক প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়েছি যখন তখন বিকেল প্রায় শেষ। সন্ধ্যা নামি নামি করছে। তখন আমার ভ্রমণ সঙ্গী শান্তিনিকেতনে ছাতিম তলা খুঁজে ফিরতে শুরু করেছে। একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করাতে একটু দূরের রাস্তার ওপারের মুল ক্যাম্পাস চত্তর দেখিয়ে দিল। ছুটলাম সেই পাশে। দুই গাধা ততক্ষণে শীতের প্রকোপে পরতে শুরু করেছি। কারন পর্যাপ্ত গরম কাপড়, টুপি থাকা সত্ত্বেও দিনে অনেক গরম থাকার কারনে সেগুলো রুমে রেখে শুধু টি-শার্ট পরেই বেরিয়েছিলাম।

কিন্তু শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গনে রোদ পরে গিয়ে সন্ধ্যা নামতেই শীতের আক্রমন শুরু হল চারদিক দিয়ে। তবুও শান্তিনিকেতনের মুল ক্যাম্পাস আর বিশ্ব কবির সৃতিময় প্রশান্তির আবাস দেখার উত্তেজনায় তখন তেমন কিছুই মনে হয়নি। ধুলো ওড়া পথে হাটা শুরু করলাম মুল ক্যাম্পাসের ফটক পেরিয়ে।

দুটো ছাউনি দেয়া প্রাচীন আমলের ঘর বা ছোট্ট একটি গ্রামের আদলে গড়ে ওঠা পুরনো বাড়ি পেরিয়ে একটু এগোতেই একজনকে বলতে শুনলাম সামনেই নাকি “বকুল বীথি!” বকুল বীথি শুনেই একটা চমক আর একটা ঝংকার লাগলো প্রানে।
তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম অনেক নাম শোনা সেই “বকুল বীথির” ছায়ার।

আহ কি যে একটা প্রশান্তিতে মন আচ্ছন্ন হয়ে গেল মুহূর্তেই, থমকে দাড়িয়ে…