ঢাকা সোমবার, জুন ৮, ২০২৬

দুরে নয় কাছের ভ্রমণ-কলাকুপা বান্দুরা হয়ে মৈনাট ঘাট

আমাদের এই শহুরে একঘেয়ে জীবনের আবসাদ থেকে একটু ভিন্ন স্বাদ নেবার সহজ পথ হলো ভ্রমণ।আর সেটা একদিনের হলে মন্দ কি। ঢাকার কাছে প্রন্ততাত্তিক নিদর্শন সহ নদীর তীরের শোভা উপভোগের চমৎকার জায়গা হল  কলাকুপা বান্দুরা হয়ে মইনাট ঘাট।বিশাল পদ্মার জলরাশি আর তার দুই পাড়ের বিস্তীর্ণর চড়ের মাঝে আছে সময় কাটানোর এক সুন্দর সুযোগ।নদীর আর নদীর পাঁড়ের অপরূপ সুন্দর দৃশ্য উপভোগের জন্যে মৈনাট ঘাট এক  আদর্শ জায়গা।

হা তবে সম্প্রতি মৈনাট  ঘাঁটে ঘটে যাওয়া কিছু  দুর্ঘটনার কথা ,আমাদের মনে রাখা দরকার।বিশেষ করে মৈনাট ঘাটে ঘটে যাওয়া বিষয় গুলো।মৈনাট ঘাটের  গোছলে নেমে অসাবধানতায় চোরাবালুতে আটকে প্রান হারায়  বেশ কজন।আর বর্ষার সময় প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়েও ঘটে একই ঘটনা।তাই  জীবনে সর্বত্র সতর্কতার বিকল্প নেই।বিশেষ করে সাঁতার যেনে যে কোন পানিতে নামা আর বালু চরে না বুজে না আগানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত বান্দুরা, কলাকোপা গ্রামটি। জায়গাটা সমৃদ্ধ প্রাচীনত্ব ও ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগের নানা ইতিহাস, নিদর্শনে। গাছপালা, সবুজ সমারহের ভিড়ে পাখির কিচিরমিচির, ইছামতী নদীর কোলঘেঁষা গ্রাম। আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাটতেও ভালো লাগবে। সাথে দেখা মিলবে উকিল বাড়ি, জজবাড়ি, আরএন হাউজ, কলাকোপা বৌদ্ধমন্দির, জমপালা রানীর গির্জা সহ আরো বহু বছর পুরানো বেশ কিছু জমিদার বাড়ির। তার থেকে ২০/২৫ মিনিটের দূরত্বেই আছে ‘মৈনটঘাট’, যাকে বর্তমানে সবাই মিনি কক্সবাজার হিসেবেই চেনে। পদ্মার পাড়ের এই সুন্দর জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে আপনার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। সবচেয়ে খুশির বিষয়, এতগুলো জায়গা ঘুরে দেখে আসতে পারবেন মাত্র এক দিনেই।

প্রথমে ঢাকার গুলিস্তান থেকে উঠতে হবে ‘যমুনা ‘ কিংবা ‘এনমল্লিক’ পরিবহনে। আগেই বলে রাখতে হবে ‘বান্দুরা’ নামিয়ে দিতে, কিংবা বলতে হবে উকিলবাড়ি যাবেন। ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা। সময় লাগবে দেড় ঘন্টা। বান্দুরা নেমে যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে উকিল বাড়ি। উকিল বাড়ি ঘুরতে আপনাকে গেটে গুণতে হবে ২০ টাকা। ভেতরে পুরনো দালানটি, একটি পুকুর আর কিছু গাছ। দেখার আর বিশেষ কিছু নেই। তাই ২০ টাকা এখানে খরচ না করে ভালো হয় গেটে ঢুকে, ভেতরে না এগিয়ে যতটুকু পারা যায় দেখে বেরিয়ে আসা।

উকিল বাড়ির পাশেই গান্ধী মাঠ ও এনআর হাউজ (হাউজটি বর্তমানে ‘শিক্ষক আবাসন’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দোতলার অংশটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় উপরে যাওয়া নিষেধ)। সেখানেই চোখে পড়বে ‘কলাকোপা বৌদ্ধমন্দিরটি। অনেকটা ভেঙে যাওয়া প্রাচীন এই মন্দিরটিতে আছে ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর ভেঙে ফেলা মূর্তিটি।

এখানটা ঘোরা শেষে আপনার খানিকটা সামনে আগাতে হবে। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে ‘জজবাড়ি’। আমরা যখন গিয়েছি তখন ভেতরে ঢোকার উপায় ছিল না। বাইরে থেকেই দেখে ফিরতে হয়েছে। তবে বাড়িটির সৌন্দর্য ছিলো মুগ্ধ করার মতো। সেই সৌন্দর্য ভেতরে না ঢুকতে পারার কষ্টটা আরো বাড়িয়ে দেবে। ভেতরে ঢুকতে না পারার চেয়েও আরো কষ্টের ছিল চিত্রাহরিণের দেখা না পাওয়া।

বান্দুরার এই জায়গাটাতে খাবারের দোকান খুব বেশি নেই। একটা মাত্র হোটেল চোখে পড়েছিল আমাদের। চাইলে সেখানেই নাস্তা করতে পারবেন। সেখান থেকে চলে যাবেন মৈনটঘাট। রাস্তায় দাঁড়ালেই অটো পাওয়া যায়। কথা বলে অটোতে চেপে বসলেই হলো, ২০/২৫মিনিটেই পৌঁছে যাবেন। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ২০ টাকা।

পদ্মারপাড় মানেই ইলিশ। মৈনটঘাট পৌঁছে সুস্বাদু ইলিশের টুকরো দিয়ে ভাত না খেয়ে আসাটা বোকামিই হবে। ‘আতাহার চৌধুরী হোটেল’টা খুঁজে নিয়ে বসে যাবেন দুপুরের খাবার সেরে নিতে। এই হোটেলটার নাম উল্লেখ করার কারণ শেষবার এখান থেকে খাবারের স্বাদ ও তাদের ব্যবহার দুইয়ে মিলেই মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতে হয়েছে। ৬ টুকরো ইলিশ ভাঁজা, ২ টুকরো সরষে ইলিশ, মুরগীর মাংস, সবজি ভাজি, ইলিশের ভর্তা আর ভাত। সব মিলিয়ে ৯জনের খাবারের বিল হয়েছিলো ৭০০টাকা।

খাবার পর্ব শেষে মৈনটঘাটের সৌন্দর্য উপভোগে লেগে যাবেন। নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে পারেন পদ্মার বুকে। সেক্ষেত্রে আগেই কথা বলে নৌকা ঠিক করে নেবেন। নৌকার ভাড়া নির্ভর করে নৌকার আকার আর কত সময় ঘুরবেন তার উপর। আলোচনা সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন দামে পাবেন। আমাদের সেদিন নৌকায় ঘোরা হয়নি, সবার ইচ্ছাতেই।

মৈনটঘাট ঘোরা শেষে সেখান থেকেই অটোতে চলে আসবেন বান্দুরা বাসস্ট্যান্ড। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২০ টাকা। অটো রিজার্ভও করতে পারেন ১২০/১৫০ টাকার মধ্যে। সর্বোচ্চ ৮ জন যেতে পারবেন একটি অটোতে। বান্দুরা বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার পথেই দেখা মিলবে ‘জমপালা রানীর গির্জা’র। বর্তমানে ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। বাইরে থেকেই দেখে নিতে হবে।

বান্দুরা বাসস্ট্যান্ড পৌঁছে  মিনিট বিশেক পর পরই পেয়ে যাবেন ঢাকাগামী বাস। শেষ বাস সন্ধ্যা ৭টায়। বাসস্ট্যান্ডে বসে চা খেতে খেতে আমাদের আড্ডাটা জমে উঠেছিল, তাই ইচ্ছে করেই আধা ঘন্টা সেখানে কাটিয়ে সেদিনের শেষ বাসটা ধরি সবাই। যাতায়াত খরচ, খাওয়া-দাওয়া সব মিলিয়ে আমাদের ৯ জনের জনপ্রতি এই ট্যুরে খরচ হয়েছিলো মাত্র ৩৪০ টাকা। সেক্ষেত্রে দল যত বড় হবে খরচ ততই কমে আসবে আপনার। কর্মব্যস্ত জীবনে একদিনের এই ট্যুরটি নিশ্চয়ই আপনাকে নতুন করে কাজের উদ্যম এনে দেবে অনেকগুলো দিনের জন্য। তাই সুযোগ পেলেই চট করে ঘুরে আসতে পারেন একটি দিন।