ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২

পুরানো দিল্লীর খাবার-দাবার-সজল জাহিদ

দিল্লীতে ছয় ঘণ্টা ট্রানজিটের দ্বিতীয় মিশনই ছিল ওল্ড বা পুরনো দিল্লী। পায়ে হেটে গলি ঘুপচি ঘুরে দেখা, পুরনো স্থাপনা, মসজিদ, মুঘল নানা কীর্তি যতটা সম্ভব দেখা যায়। কিন্তু মেট্রোর মারপ্যাঁচে পরে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আকশারাধাম থেকে ওল্ড দিল্লী জামা মসজিদ পর্যন্ত ৮ থেকে সাড়ে আট কিলোমিটার দুরত্তের পথের জন্য ১২০ রুপী দিয়ে অটো ভাড়া করলাম।

কারন বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বলে এরচেয়ে কমে কারো কাছে পাইনি। আর এই ১২০ রুপীর অটো ভাড়াই ছিল আমার পুরো ট্যুরের তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশী খরচের বাহন। কিন্তু তখন সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, কারন আর সময় নষ্ট না করে পুরনো দিল্লীর অলিগলি আর মুখরোচক খাবার-দাবার কিছুতেই মিছ করতে চাইনা আমি।

রাস্তা বেশ ফাঁকাই ছিল অন্যান্য সময়ের দিল্লীর স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে। যে কারনে বেশ দ্রুতই পৌঁছে গেলাম পুরনো দিল্লীর প্রবেশদ্বারে। পুরনো দিল্লীতে। যে ঢুকে পরেছি সেটা বেশ বোঝা গেল, লোকজনের সমারোহ, জ্যাম, গলি, ঘুপচি, নানা রকম দোকান, বোরকা আর টুপি পরিধান করা পুরুষ ও মহিলাদের দেখে। আর সেই সাথে আছে নানা রকম খাবার ও মিষ্টান্নর সুঘ্রাণ। যা কাছে দূরে থেকে বাতাসে ভেসে এসে নাকে এসে লাগছে আর লেগেই রয়েছে যেন! সেই ঘ্রাণেই যেন অনেকটা স্বাদ পাওয়া যাচ্ছিল নানা রকম মুঘল খাবারের।

অনেক চেষ্টা করেও অটো আর জামা মসজিদ পর্যন্ত এগোতে পারছেনা মানুষ আর ছোট নানা রকম পন্য বোঝাই বাহনের ভিড়ে। কয়েক মিনিট বসে থেকে অধৈর্য হয়ে অবশেষে নেমেই গেলাম পায়ে হেটে বাকি পথ এগিয়ে যাবো বলে। অটোওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে করিম’স আর জামা মসজিদের লোকেশন যেনে পথ ধরলাম। বেশ ভালোই করেছিলাম অটো ছেড়ে পায়ে হাটার পথ ধরেছিলাম বলে। নইলে এতো এতো ভিড়ে অটোতে করে সামনের পথটুকু এগোলে সত্যিকারের পুরনো দিল্লী আর দেখা হতনা হয়তো।

ওল্ড দিল্লীতে যখন পায়ে হাটা শুরু করি তখন সন্ধ্যা বেশ আগেই শেষ হয়ে রাতের আধার ঠিকই নেমেছিল কিন্তু দিল্লীর রাজপথের ঝলমলে আলো সেটাকে ঢেকে রেখেছিল। তবে ওল্ড দিল্লী গিয়ে সন্ধ্যা বা রাতের কিছুটা বোঝা গেলনা, ওখানকার আলোর রোশনাইয়ের কারনে, ঝলমলে আলো আর গমগমে চারপাশ সেই সাথে হাজারো মানুষের অবিরত কলরব কোনভাবেই বুঝতে দেয়না এটা সন্ধ্যা, রাত নাকি দিনের ব্যাস্ততম কোন ভাগ। এতো আলো, এতোই ঝলমলে আর এতোই কর্মব্যাস্ত সবাই।

পথের একপাশে নানা রকম সবজি, মসলা, মাছ মাংসের দোকানে নানা রকম পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। দোকান গুলোর পরেই ছোট ছোট প্রাচীন, ঘুনে ধরা বা প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া নানা রকম স্থাপনা। অন্যপাশে একদম আলো ঝলমলে হোটেল, দোকান-পাট, নানা রকম মনোহারি দোকান, খেজুর, মিষ্টান্ন, কাবাব, মাঠা, ঘোল, রাবড়িসহ দুধের কত রকম যে খাবারের আয়োজন নাম জানা তো দূরের কথা এতো এতো খাবারের ধরন যে হতে পারে সেটাই কোনদিন মাথায় আসেনি। আর সেসব শুধু মিষ্টি, দুধ বা ডেজারট জাতীয় খাবার। সেগুলো দেখছি আর জিভে টলটলে জল দিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছি।

আর একটু সামনে এগোতেই আমার মাথা প্রায় নষ্ট হবার জোগাড়! কাবাবের মাংস পোড়ার নেশাতুর গন্ধে, এবার জিভের জল গড়িয়ে পড়লো বলে… কোন মতে নিজেকে সামলে নিলাম আর বোঝালাম, এই তো আর একটু সামনে গিয়েই তো করিম’স এ ঢুকে পরবো। তারপর খানাদানা হবে জম্পেস। কিন্তু দুই তিনটা গলি সামনে এগিয়েও করিম’স আর খুঁজে পাইনা। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম চলার পথে বেশ আগেই করিমস ফেলে এসেছি পিছনে। অগত্যা আবারো পিছনে ছুটতে হল। দুইপাশে ভালো করে দেখতে দেখতে যেখানে করিম’স পেলাম সেটা আসলে অচেনা মানুষের খুঁজে পাবার কোন কারনই নেই।

কারন একদম মেইন রোডেই করিম’স এর অবস্থান নয়। মেইন রোডের সাথে অসংখ্য গলির মাঝে একটি গলির ভিতরে আসল করিম হোটেল এর অবস্থান। যাক খুঁজে তো পেলাম অবশেষে। এবার তবে খাবার পালা। কি, কি আছে? মেন্যু কার্ড কি দেখবো, চারাশের টেবিলের টেবিলে যেসব খাবার দেখা যাচ্ছে তাই দেখেই মাঠা খারাপের অবস্থা। এক মাটনেরই আছে তিন রকমের বিরিয়ানি, চিকেন আর বিফ তো আছেই।

আর কাবাবের কথা না হয় নাই বললাম, শেষে আমার কিবোর্ডে জিভের জলে ভেসে যেতে পারে! পাশাপাশি এক এক জনকে দেখলাম বিশাল বোলের মাটন বিরিয়ানির সাথে আবার মুরগির রেজালা, রোস্ট বা আলাদা কারী নিয়ে খেতে শুরু করেছে! যেন অনেকদিন পরে সবাই এসব খেতে পারছে এমন সবার অভিব্যাক্তি আর চাহিদা দেখে মনে হল। আর দামও মাশাল্লাহ, আমার সাধ্যের বাইরেই বলা যায়।

তাই মনে মনে ঠিক করলাম। আপাতত মোটামুটি কাবাব আর নান দিয়েই ডিনার পর্ব শেষ করি মিশন শেষ করেই না হয় বিরিয়ানি পর্বের সুচনা করা যাবে। কাবাব আর নানের অর্ডার দিয়ে বসে আছি, এমন সময় দেখি আমার টেবিলের পাশে যে বসেছিল তার সামনে এনে বিশাল এক প্লেটে ১৪-১৫ টুকরো মুরগির কোন একটা একদমই নাম না জানা আইটেম এনে রাখলো।

পোড়া মুরগির উপরে বাদামি রঙের গ্রেভি একটা রসালো প্রলেপ। সাথে দুটি নান। আমি ভাবলাম, আরও দুই তিনজন লোকজন আছে হয়তো। সবার জন্য একই সাথে অর্ডার করেছে। কিন্তু না, পাশের পাঠান একাই একটু পরে প্লেট সামনে নিয়ে সমানে সাঁটিয়ে গেলেন, সেই মুরগির স্তুপ আর নান। ওগুলো সাবাড় করে আবার একটা ক্ষীরের অর্ডার দিলেন! সর্বনাশ কিভাবে সম্ভব? পরে ওনার উপরে পূর্ণ নজর রেখে দেখলাম মাত্র ৯০০ রুপী বিল দিলেন একাই!

আর তার পাশের টেবিলে আর দুই পাঠান একটা পূর্ণ মাটন বিরিয়ানি, সাথে মুরগির রোস্ট, দুটো করে কাবাব যেন ঝরের বেগে কোন রকম ক্লান্ত না হয়েই শেষ করে ফেললেন আর আমি বিস্মিত হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখলাম! যা আমাদের সাধারন কোন মানুষের অন্তত ৬ জনের খাবার। খুব বেশী করে খেলেও। সেটাই দুজনেই সাবাড় করে ফেললেন আর বিল যে কত দিলেন সেটা দেখার দুঃসাহস আমার আর হয়নি। আমি আবার আমার কাবাব আর নানে মনোযোগ দিলাম। সাথে পিয়াজের সালাদ, চাটনি আর ঠাণ্ডা কোমল পানীয় দিয়ে ডিনার শেষ করে ১৫৫ রুপীর বিল মিটিয়ে নিউ দিল্লী স্টেশনের পথ ধরলাম। অনেক পছন্দের নন্দাদেবী এক্সপ্রেসে দেরাদুন যাবো।

তবে হ্যাঁ পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দিল্লী গেলে বা যেতে আসতে রাতে সময় পেলে এবং অবশ্যই সাথে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে পুরনো দিল্লীর খাবার দাবারের স্বাদ একবার নিতেই পারেন কিন্তু। কারন এখানে আসল মুঘল স্বাদের সেইসব খাবারের সমারোহ এখনো আছে। আছে সেই স্বাদ, সেই ফ্লেভার আর সেই আকর্ষণ এখনো।

আর যেহেতু বনেদী এবং রাজা মহারাজাদের ব্যাপার স্যাপার সেহেতু দামে তো একটু নয় বেশ বেশী হবেই। সেটাই স্বাভাবিক। তবে হ্যাঁ দাম যতই হোক, একবার খেলে কিন্তু মনে থাকবে ঠিক ঠিক। যেমন আমি ভুলতে পারছিনা দেরাদুনে খাওয়া আর উপভোগ করা সেই মাটন ইস্টুর কথা! সেই গল্প অন্যদিনে…